যুদ্ধবিরতি জোরদারে কায়রো যাচ্ছে হামাস, মিসরীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক
গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি আরও সুসংহত করা এবং পরবর্তী ধাপের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনার জন্য মিসরের রাজধানী কায়রো যাচ্ছে হামাসের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। রোববার প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান খলিল আল-হাইয়া। মিসরীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে গাজা পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
হামাসের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলটি কায়রোতে মিসরের জেনারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান হাসান রাশাদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে। আলোচনার প্রধান বিষয় হবে গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং এর বাস্তবায়নকে আরও শক্তিশালী করার উপায়।
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলে যারা
কায়রোগামী হামাস প্রতিনিধি দলে আল-হাইয়া ছাড়াও সংগঠনটির শূরা কাউন্সিলের প্রধান মোহাম্মদ দারবিশ, বিদেশে হামাসের প্রধান খালেদ মেশাল, পশ্চিম তীরে সংগঠনটির প্রধান জাহের জাবারিন এবং আরব ও ইসলামিক সম্পর্কবিষয়ক কার্যালয়ের প্রধান বাসেম নাইম রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আল-হাইয়ার নেতৃত্বে এই সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। হামাসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেওয়ার পর মিসরে এটি তার প্রথম সফর বলে জানিয়েছে আনাদোলু। ফলে যুদ্ধবিরতি ছাড়াও ফিলিস্তিন ইস্যুর বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নই আলোচনার কেন্দ্রে
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও এর বাস্তবায়ন নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা, ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের ধাপ, হামাসের অস্ত্র সমর্পণ এবং গাজার প্রশাসনিক কাঠামো—এসব বিষয়কে ঘিরে মতপার্থক্য রয়েছে।
বর্তমান মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইসরায়েলি বাহিনীর পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। হামাস পরিকল্পনাটিতে নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অবস্থান বড় বাধা হয়ে আছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের আগে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারে আপত্তি জানিয়েছেন।
কায়রো আবারও কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র
গাজা সংকট সমাধানে মিসর দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। এর আগে কায়রোতে হামাস, ফিলিস্তিনি অন্যান্য পক্ষ এবং মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে একাধিক দফা বৈঠক হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও গাজা যুদ্ধবিরতি এগিয়ে নিতে মিসর, কাতার ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের আলোচনা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কায়রো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহে ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার এবং গাজা বিষয়ে মার্কিন ‘বোর্ড অব পিস’-এর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মিসর সফরের কথা রয়েছে। তাদের সফরের লক্ষ্যও যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়া।
গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়েও আলোচনা
শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার প্রশাসন ও পুনর্গঠনও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। মার্কিন পরিকল্পনায় গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি নতুন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কাঠামোর হাতে দেওয়ার এবং অঞ্চলটির পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে দুই পক্ষের মতপার্থক্য কতটা দূর করা যায় তার ওপর।
বড় প্রশ্ন—যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে হামাসের কায়রো সফরকে যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মিসরীয় মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি আরও সুসংহত করা এবং পরবর্তী ধাপের বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আলোচনার পথে এখনো বেশ কিছু কঠিন প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের ক্রম, গাজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাস পরিকল্পনাটিতে সম্মতি জানালেও ইসরায়েল এখনো সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে সেনা প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছে।
ফলে কায়রোর বৈঠক শুধু একটি নিয়মিত কূটনৈতিক বৈঠক নয়; গাজায় যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘস্থায়ী করা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হয় এবং হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে বিদ্যমান মূল বিরোধগুলো কতটা কমানো সম্ভব হয়—এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা