ধীরে ধীরে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে: নাহিদ ইসলাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশে ধীরে ধীরে গণতন্ত্র ও কথা বলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে স্বাধীন, মুক্ত ও বস্তুনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্সের আয়োজনে ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো একইভাবে উঠে এসেছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশে একটি মুক্ত পরিবেশ রয়েছে—তবে এই পরিবেশ কতদিন থাকবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর ভাষায়, ধীরে ধীরে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে আসছে এবং মানুষের কথা বলার জায়গাও সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকোচন ঠেকাতে সাংবাদিকসহ সমাজের সবাইকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ নিয়ে প্রশ্ন
বক্তব্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিতে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হলেও সেটিকে ‘হঠকারিতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
তাঁর মতে, গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ করা এবং ভাঙচুর বা সহিংস কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখা উচিত নয়। তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদের ভেতরে যেমন কথা বলবে, তেমনি সংসদের বাইরেও রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ ও অহিংসভাবে মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। রাস্তায় বসে বিক্ষোভ করাও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি বৈধ পদ্ধতি হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর জোর
নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও মুক্তভাবে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করবে, আর সাংবাদিকদের কাজ হবে সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা। তাঁর মতে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক পরিবেশও শক্তিশালী করা কঠিন হবে।
জুলাই আন্দোলনে সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা
বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকদের ভূমিকারও প্রশংসা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সাংবাদিকরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মাঠে থেকে কাজ করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও দৃশ্য মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ওই সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। মফস্বল, মাল্টিমিডিয়া ও নাগরিক সাংবাদিকদের ভূমিকাও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানান তিনি। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, নিরাপত্তাহীন পরিবেশে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন।
রাজনৈতিক পরিসর নিয়ে উদ্বেগ
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেন সংকুচিত না হয়। তিনি মনে করেন, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে তাঁর এসব বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক অবস্থান ও সমালোচনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এ বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া বা পাল্টা ব্যাখ্যা একই সময়ের প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। ফলে নাহিদ ইসলামের অভিযোগগুলোকে তাঁর বক্তব্য হিসেবেই দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় জুলাই আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের ভূমিকা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের দায়িত্বসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের সারকথা: গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের জায়গা যেন আরও সংকুচিত না হয়, সে জন্য রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সব পক্ষকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।