যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ ঝড়-বন্যা: ইন্ডিয়ানায় চার বছরের শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু
মো: নাজমুল হাসান বাবু ||
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে কয়েক দিন ধরে চলা শক্তিশালী ঝড়, প্রবল বৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যায় অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে চার বছরের এক শিশুও রয়েছে। ১১ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া দুর্যোগে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, সড়ক যোগাযোগে বিপর্যয় এবং জরুরি উদ্ধার তৎপরতা চালাতে হয়েছে।
রাজ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ছয়জনের মধ্যে তিনজন নারী, দুইজন পুরুষ এবং চার বছরের শিশুটি রয়েছে। বিভিন্ন কাউন্টিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
কয়েক দিনের টানা ঝড়ে বিপর্যস্ত জনজীবন
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট থেকে ইন্ডিয়ানা ও আশপাশের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে একের পর এক শক্তিশালী ঝড় আঘাত হানতে শুরু করে। ঝড়ের সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাত ও দমকা বাতাসের কারণে বহু এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। কোথাও কোথাও নদী ও খালের পানি বিপজ্জনক মাত্রায় উঠে যায়।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের কিছু এলাকায় ১১ ইঞ্চিরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ইন্ডিয়ানার নদীগুলোতে পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে ব্যাপক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রাণ গেল চার বছরের শিশুর
দুর্যোগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে জেনিংস কাউন্টিতে। ঝড়ের সময় একটি গাছ উপড়ে একটি বাড়ির ওপর পড়ে। এতে চার বছরের এক শিশু প্রাণ হারায়। শিশুটির ঘরের ওপরই গাছটি পড়ে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ঝড়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে বিভিন্ন এলাকায় গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও জরুরি সেবাদানকারী কর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায় নদীর পানি
ইন্ডিয়ানাপোলিস ও আশপাশের এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় হোয়াইট রিভারের পানি বৃদ্ধি। নদীর পানি কয়েকটি এলাকায় ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছায়। ফলে নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং কোথাও কোথাও নৌকা ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বন্যার পানিতে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় গাড়ি ও ভবনের নিচের অংশ পানিতে ডুবে যায়। উদ্ধারকর্মীরা পানিবন্দি বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে কাজ করছেন
বিদ্যুৎহীন লাখো মানুষ
ঝড়ের তাণ্ডবে ইন্ডিয়ানা ছাড়াও ইলিনয়, ওহাইও ও কেন্টাকির বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। ঝড়ের এক পর্যায়ে চার অঙ্গরাজ্যে প্রায় ১০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছিলেন।
ঝোড়ো বাতাসে অসংখ্য গাছ ও বিদ্যুতের লাইন ভেঙে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হচ্ছে।
এর আগে ঝড়ের সময় গ্যারি, ইন্ডিয়ানায় ঘণ্টায় প্রায় ৯৯ মাইল বেগের ‘ডেরেকো’ ধরনের প্রবল বাতাস রেকর্ড করা হয়েছিল।
জরুরি অবস্থা ও ফেডারেল সহায়তা
পরিস্থিতির অবনতির পর ইন্ডিয়ানার গভর্নর মাইক ব্রাউন রাজ্যজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে ন্যাশনাল গার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থাকে কাজে লাগানো হয়। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল জরুরি সহায়তার অনুমোদন দেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই সহায়তার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার, আশ্রয়, অবকাঠামো পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত ফেডারেল সহায়তা পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
বন্যার পানি কমলেও ঝুঁকি কাটেনি
রোববার কিছু এলাকায় বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করলেও কর্তৃপক্ষ বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ নদী ও জলাশয়ের পানি নামতে সময় লাগছে এবং কিছু এলাকায় এখনো আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসও দ্রুতগতির বন্যার পানিতে না যাওয়ার এবং প্লাবিত সড়কে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বন্যার স্রোত বাইরে থেকে যতটা শান্ত মনে হয়, বাস্তবে তা অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী হতে পারে।
ইন্ডিয়ানায় এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক করা। তবে ঝড়-বন্যার এই ভয়াবহতায় ছয়টি প্রাণহানি এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি অঙ্গরাজ্যটির জন্য তৈরি করেছে এক গভীর মানবিক সংকট।
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা