মহাকাশে ধান চাষে চীনের যুগান্তকারী সাফল্য, খুলছে চাঁদ-মঙ্গলে কৃষির দ্বার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক ||
পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ওপরে মহাকাশে ধান চাষ করে নতুন সাফল্য অর্জন করেছেন চীনের নভোচারীরা। চীনের তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে চলমান পরীক্ষার অংশ হিসেবে নভোচারীরা কক্ষপথে ধানের চারা উৎপাদন ও প্রথম দফার নমুনা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীদের কাছে এই সাফল্য মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কক্ষপথে ‘বীজ থেকে বীজ’ গবেষণা
চীনের শেনঝৌ-২৩ মিশনের নভোচারীরা এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। গত ২৪ মে মিশনটি উৎক্ষেপণের পর ধানের বীজসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপকরণ তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে। এরপর মাইক্রোওয়েভ ওভেনের আকারের একটি বিশেষ পরীক্ষামূলক ইউনিটে ধানের বীজ অঙ্কুরিত করা হয় এবং ধীরে ধীরে চারাগুলো বেড়ে ওঠে।
এবারের গবেষণার বিশেষত্ব হলো—শুধু ধান জন্মানো নয়, মহাকাশের মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশে একাধিক প্রজন্ম ধরে ধানের জীবনচক্র পর্যবেক্ষণ করা। বিজ্ঞানীরা ধানের জেনেটিক স্থিতিশীলতা, প্রজননক্ষমতা এবং মহাকাশ পরিবেশে অভিযোজনের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করছেন।
২০২২ সালের সাফল্যের ওপর নতুন পরীক্ষা
মহাকাশে ধান চাষে এটি চীনের প্রথম উদ্যোগ নয়। ২০২২ সালে শেনঝৌ-১৪ মিশনের সময় চীনা নভোচারীরা কক্ষপথে ধানের পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। সেই পরীক্ষায় ছয়টি ধানের বীজ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ৫৯টি প্রথম প্রজন্মের মহাকাশ-উৎপাদিত বীজ পাওয়া যায়। পরে এসব বীজ পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে গবেষণা চালানো হয়।
বর্তমান পরীক্ষায় সেই গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাধারণ ধানের বীজের পাশাপাশি ২০২২ সালের মহাকাশ-পরীক্ষা থেকে পাওয়া বীজের বংশধরও ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন, মহাকাশের পরিবেশ একাধিক প্রজন্ম ধরে ধানের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
কেন মহাকাশে ধান চাষ এত গুরুত্বপূর্ণ?
মহাকাশে দীর্ঘদিন অবস্থানকারী নভোচারীদের খাবারের প্রায় সবটাই পৃথিবী থেকে সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে মানুষ যদি চাঁদ, মঙ্গল বা আরও দূরের মহাকাশ গন্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি মিশনে যায়, তখন নিয়মিত পৃথিবী থেকে খাবার পাঠানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠবে।
সেই কারণে মহাকাশেই খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধান সফলভাবে চাষ করা গেলে এটি শুধু খাদ্যের উৎস হিসেবেই নয়, মহাকাশে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও প্রজনন নিয়ে আরও বড় গবেষণার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে উদ্ভিদের পরীক্ষা
পৃথিবীতে উদ্ভিদ স্বাভাবিকভাবে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে বেড়ে ওঠে। কিন্তু মহাকাশে মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশে উদ্ভিদের শিকড়, কাণ্ড, পানি শোষণ, পুষ্টি গ্রহণ এবং প্রজনন প্রক্রিয়া ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে।
তাই মহাকাশে ধান চাষের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন—মাধ্যাকর্ষণ প্রায় না থাকার পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য কতটা স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং পরবর্তী প্রজন্মে তার বৈশিষ্ট্য কতটা স্থিতিশীল থাকে।
চাঁদ ও মঙ্গলে ভবিষ্যৎ কৃষির পথ
চীনের এই গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য শুধু তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে ধান উৎপাদন নয়। মহাকাশে স্থায়ীভাবে খাদ্য উৎপাদনের প্রযুক্তি তৈরি হলে ভবিষ্যতে চাঁদ কিংবা মঙ্গলে মানুষের ঘাঁটি স্থাপনের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে মঙ্গল বা চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি মানব বসতি গড়ে উঠলে সেখানে পানি, পুষ্টি, আলো ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ব্যবহার করে উদ্ভিদ চাষের ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। বর্তমানের মতো মহাকাশ স্টেশনে পরিচালিত পরীক্ষাগুলো সেই ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত
চীনের মহাকাশ কর্মসূচিতে বর্তমানে মানবদেহ, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা চলছে। শেনঝৌ-২৩ মিশনের নভোচারীদের জন্য একাধিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নির্ধারিত রয়েছে, যার মধ্যে ধান চাষ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা।
মহাকাশে ধান উৎপাদনের এই সাফল্য তাই শুধু একটি কৃষি পরীক্ষা নয়; এটি ভবিষ্যতে পৃথিবীর বাইরে মানুষের টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। আজ তিয়াংগংয়ের পরীক্ষাগারে যে ধানের চারা বেড়ে উঠছে, আগামী দিনে সেটিই হয়তো চাঁদ বা মঙ্গলে মানুষের খাদ্য উৎপাদনের প্রযুক্তির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা