শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল: হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, জবাবদিহি কোথায়?
মোঃ নাজমুল হাসান বাবু || বিশেষ প্রতিবেদন ||
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের বড় অংশ অর্থায়ন করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকা। নির্মাণকাজে রয়েছে জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি নিয়ে গঠিত এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)।
দেশের আধুনিক বিমান যোগাযোগের প্রতীক হওয়ার কথা যে প্রকল্পটির, সেটিই এখন ব্যয় বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বিল, চুক্তি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে প্রায় ৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এ অঙ্ককে সরকারি নিরীক্ষার চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (CAG) নিরীক্ষায় আলাদাভাবে ৪ হাজার ৪৬৯ কোটি ৯ লাখ ৩১ হাজার ৭৬৬ টাকার আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
সরকারি নিরীক্ষায় কী উঠে এসেছে?
CAG-এর নিরীক্ষায় চুক্তির বাইরে অর্থ পরিশোধ, অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত বিল, ক্ষতিপূরণ আদায় না করা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মসহ ২৭টি খাতে আপত্তি ওঠার কথা জানা গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলেও ঠিকাদারের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়নি। এতে সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।
এ ছাড়া তৃতীয় টার্মিনালের সফট ওপেনিং আয়োজনের জন্য চুক্তি বা ডিপিপিতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ না থাকলেও ঠিকাদারকে প্রায় ৪৪ কোটি ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৪ টাকা দেওয়ার বিষয়েও নিরীক্ষা আপত্তি জানিয়েছে।
পরামর্শককে চুক্তির বাইরে অর্থ প্রদান, পণ্য সংগ্রহ, মূল্য সমন্বয় এবং কোভিড-সংক্রান্ত ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগ
প্রকল্পটির ব্যয় শুরুতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও পরে তা প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। এ ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।
তৎকালীন অভিযোগের মধ্যে ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, স্থানীয় যন্ত্রপাতিকে বিদেশি পণ্য হিসেবে দেখানো, মাটি পরীক্ষার ফল পরিবর্তন এবং নকশা পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সম্ভাবনা।
দায় কার?
তৃতীয় টার্মিনালের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো কোনো একক সময় বা সরকারের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। পরিকল্পনা, অনুমোদন, দরপত্র, চুক্তি, ভেরিয়েশন, বিল পরিশোধ ও পরবর্তী সমঝোতা—প্রতিটি পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা রয়েছে।
নথিতে প্রকল্প পরিচালক, বেবিচক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, পরামর্শক এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ভূমিকা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; কার স্বাক্ষরে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং সেই সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না—তা স্বাধীন তদন্তে নির্ধারণ করাই জরুরি।
দুদকের অনুসন্ধানের অগ্রগতি কোথায়?
প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠছে—সেই অনুসন্ধানের অগ্রগতি কোথায়?
হাজার হাজার কোটি টাকার অভিযোগ থাকলে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তাকে নয়, প্রকল্পের সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এদিকে বেবিচক তৃতীয় টার্মিনালের ব্যয় ও অনিয়ম নিয়ে প্রকাশিত কিছু তথ্যকে খণ্ডিত ও প্রেক্ষাপটবিহীন দাবি করেছে এবং প্রকল্পে অনুমোদিত পদ্ধতি ও চুক্তির বিধান অনুসরণের কথা জানিয়েছে।
আরও বড় আর্থিক প্রশ্ন
প্রকল্প নির্মাণ শেষ হলেও আর্থিক বিরোধ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার একটি সিদ্ধান্তে বেবিচককে এডিসিকে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই অতিরিক্ত অর্থের দাবির পেছনে কোন সিদ্ধান্ত ছিল? কার অনুমোদনে তা হয়েছে? এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে নেওয়া এসব সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্টদের কোনো জবাবদিহি থাকবে কি না?
এখন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন
১. CAG-এর নিরীক্ষায় শনাক্ত ৪ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার অনিয়মের প্রতিটি খাত কি তদন্ত করা হবে?
২. ৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার বৃহত্তর অভিযোগের হিসাব কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হবে?
৩. প্রকল্পের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ভূমিকা কি নথিভিত্তিকভাবে পরীক্ষা করা হবে?
৪. চুক্তির বাইরে বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত কারা নিয়েছিলেন—তা কি প্রকাশ করা হবে?
৫. অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
শেষ কথা
তৃতীয় টার্মিনাল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় অবকাঠামো। তাই এর সঙ্গে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত—যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণই হবে দায় নির্ধারণের ভিত্তি।
কে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কে অনুমোদন দিয়েছেন, কার সিদ্ধান্তে অর্থ পরিশোধ হয়েছে এবং রাষ্ট্রের কতটা ক্ষতি হয়েছে—জনগণের সামনে এখন মূলত এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর প্রয়োজন।
কারণ জনগণের অর্থে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পের প্রতিটি টাকার হিসাব শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হবে।