কানাডার রাজনীতিতে বাংলাদেশি অধ্যায় আরও বিস্তৃত, এমপি নির্বাচিত তানভীর শাহনেওয়াজ
কানাডা প্রতিনিধি :
কানাডার রাজনীতিতে নতুন মাইলফলক তৈরি করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান তানভীর শাহনেওয়াজ। সোমবার (৩১ আগস্ট) অনুষ্ঠিত ফেডারেল উপনির্বাচনে টরন্টোর বিচেস–ইস্ট ইয়র্ক আসন থেকে লিবারেল পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে কানাডার হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে জায়গা করে নিলেন ৩০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।
তবে তানভীরকে কানাডার পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি বলা সঠিক নয়। চলতি বছরের এপ্রিলে স্কারবরো সাউথওয়েস্ট আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে ডলি বেগম কানাডার ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি হন। কানাডার পার্লামেন্টের সরকারি প্রোফাইলেও তাকে এ ক্ষেত্রে প্রথম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়
ইলেকশনস কানাডার প্রকাশিত প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, বিচেস–ইস্ট ইয়র্কে তানভীর শাহনেওয়াজ পেয়েছেন ১৮ হাজার ৩৬১ ভোট, যা মোট বৈধ ভোটের ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (NDP) শ্যানন ডিভাইন পেয়েছেন ৮ হাজার ৫১২ ভোট বা ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ। কনজারভেটিভ প্রার্থী জিম সিরবোস পেয়েছেন ৫ হাজার ১১৬ ভোট বা ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ
এ ছাড়া গ্রিন পার্টির ব্রুস লাইভসেইভ ১ দশমিক ৭ শতাংশ, পিপলস পার্টির মিশেল লাশাঁ ০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কানাডিয়ান ফিউচার পার্টির ক্যামেরন থমাস ০ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। ২০০টি ভোটকেন্দ্রের সবকটির ফল প্রকাশের পর এই প্রাথমিক ফল পাওয়া যায়। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিচেস–ইস্ট ইয়র্কেই বেড়ে ওঠা
তানভীর শাহনেওয়াজের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে বিচেস–ইস্ট ইয়র্ক এলাকার দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। নির্বাচনের পর বিজয়ী ভাষণে তিনি জানান, তার বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আসেন তার জন্মের বছর। তিনি টরন্টোর ইস্ট জেনারেল হাসপাতালে—বর্তমানে মাইকেল গ্যারন হাসপাতাল—জন্মগ্রহণ করেন এবং ছোটবেলা থেকেই বিচেস–ইস্ট ইয়র্কে বেড়ে ওঠেন।
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি প্রায় এক দশক সাবেক লিবারেল এমপি নাথানিয়েল ‘নেট’ এরস্কিন-স্মিথের সঙ্গে কাজ করেন। প্রথমে তার নির্বাচনী কার্যালয়ে কাজ করা এবং পরে অফিস ম্যানেজার ও বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তানভীরকে স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত করে তোলে।
সাবেক এমপির আসনেই উত্তরসূরি
বিচেস–ইস্ট ইয়র্ক আসনটি দীর্ঘদিন ধরে লিবারেলদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সাবেক এমপি নাথানিয়েল এরস্কিন-স্মিথের পদত্যাগের পর আসনটি শূন্য হলে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়। তানভীর জুলাই মাসে লিবারেল পার্টির মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে দলের প্রার্থী হন।
এরস্কিন-স্মিথের নির্বাচনী কার্যালয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে তানভীরের পূর্বপরিচিতি ও দীর্ঘদিনের কমিউনিটি সম্পৃক্ততা তার প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
কমিউনিটি সেবায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি কার্যক্রমেও তানভীরের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তিনি পূর্ব টরন্টোর বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় মোবাইল টিকাদান কার্যক্রমে সহায়তা করেন। স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
তার নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম জোর ছিল স্থানীয় মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি।
বিজয়ের পর তানভীরের প্রতিক্রিয়া
বিজয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তানভীর বলেন, বিচেস–ইস্ট ইয়র্ককে প্রতিনিধিত্ব করা তার জন্য “আজীবনের সম্মান”। তিনি কমিউনিটি, অভিজ্ঞতা, কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে কানাডা এবং বিচেস–ইস্ট ইয়র্ককে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এই বিজয়ের মাধ্যমে কানাডার ফেডারেল রাজনীতিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিত্ব আরও শক্তিশালী হলো। একই বছরে ডলি বেগমের ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর তানভীর শাহনেওয়াজের জয় কানাডার হাউস অব কমন্সে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধির সংখ্যা দুইয়ে উন্নীত করল।
লিবারেল পার্টির জন্যও বিচেস–ইস্ট ইয়র্কের জয় গুরুত্বপূর্ণ। ৩১ আগস্টের একই দিনে কানাডার আরও দুটি ফেডারেল উপনির্বাচনেও লিবারেল প্রার্থীরা জয়ী হন, ফলে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দল হাউস অব কমন্সে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও সুসংহত করেছে।