বিদ্যুতের বেহাল দশা: ৩৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার দেশেও কেন অন্ধকার?
মো: নাজমুল হাসান বাবু ॥
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ॥
ঢাকা: বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে গত দেড় দশকে বাংলাদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। একের পর এক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে, বেড়েছে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎ আমদানি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে বড় বড় প্রকল্প। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট।
কিন্তু সেই সক্ষমতার সঙ্গে বাস্তব বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্রের যেন কোনো মিল নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিতে সেচ কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে, ব্যবসায়ীদের বাড়ছে জেনারেটর ও বিকল্প বিদ্যুতের খরচ। অন্যদিকে তীব্র গরমের মধ্যে সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন সময়।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে—৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বাংলাদেশে বিদ্যুতের এই সংকট কেন?
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি সংকট, অতিরিক্ত সক্ষমতা, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, বিপুল বকেয়া, আমদানিনির্ভরতা, আর্থিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার নানা প্রশ্ন।
কাগজে ৩৩ হাজার মেগাওয়াট, কিন্তু বাস্তবে এত বিদ্যুৎ কোথায়?
বিদ্যুৎ বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে দেশে বর্তমানে ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। অথচ ২০ মে ২০২৬-এ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট।
এই ব্যবধানই বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি।
কারণ কোনো দেশের installed capacity বা স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা মানেই হলো না যে সব সময় সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস বা কয়লা না থাকলে, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে থাকলে, আর্থিক কারণে জ্বালানি কেনা না গেলে কিংবা গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা না থাকলে সেই কেন্দ্রের নামমাত্র সক্ষমতা বাস্তবে কোনো কাজে আসে না।
অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান সংকটকে শুধু ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র কম’ বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বরং বড় প্রশ্ন হলো—বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে, তার কতটুকু বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য?
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির তথ্যও এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের কয়েক হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত অথবা জ্বালানি ও গ্রিড-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যত অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে এসেছে গ্যাসের ঘাটতি।
১৮ আগস্টের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। একদিকে হাজার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত পড়ে থাকে, অন্যদিকে গ্রাহকদের জন্য লোডশেডিং করতে হয়।
এখানেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই সক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।
LNG-নির্ভরতার ঝুঁকি কতটা?
বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
জুলাইয়ে একটি ভাসমান LNG টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা আসে। পরে টার্মিনালটির কার্যক্রম আংশিকভাবে পুনরায় শুরু হলেও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আগস্টে খারাপ আবহাওয়ার কারণে আরেকটি LNG টার্মিনালের কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দেয়।
ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—একটি বা দুটি LNG অবকাঠামোতে সমস্যা দেখা দিলেই যদি জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়ে, তাহলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী?
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা বৈদেশিক বাজারের ধাক্কার প্রতি আরও সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে।
লোডশেডিংয়ের পেছনে কত বড় ঘাটতি?
আগস্টের শুরু থেকেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি দ্রুত বাড়তে থাকে।
৬ আগস্ট জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৩৩৫ মেগাওয়াট। পরদিন তা বেড়ে ৭৪০ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। ৮ আগস্ট ঘাটতি পৌঁছে যায় ২ হাজার ১৬৭ মেগাওয়াটে। পরদিন গড় ঘণ্টাপ্রতি লোডশেডিং প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
১২ আগস্ট রাত ৮টার দিকে দেশের গড় ঘণ্টাপ্রতি বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল প্রায় ২ হাজার ৭৪৫ মেগাওয়াট। এই পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক লোডশেডিং কোনো বিচ্ছিন্ন স্থানীয় সমস্যা নয়। জাতীয় পর্যায়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
শহর বাঁচাতে গ্রাম অন্ধকারে?
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছে গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চল।দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত চাহিদা সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াটের মতো সরবরাহ পেয়েছে।
ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান মেটাতে গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিতে সেচ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হিমাগার, স্থানীয় শিল্প এবং শিক্ষা কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ছে।
এতে প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরবরাহ বণ্টনের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে কোনো বৈষম্য তৈরি হচ্ছে কি না।
এত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরও সংকট কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের গত দেড় দশকের পরিকল্পনার দিকে তাকাতে হয়।বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকার দ্রুতগতিতে বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে চুক্তির আওতায় আনে। অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে বিশেষ আইনি কাঠামোর মাধ্যমে চুক্তি করা হয়েছিল।
২০২৬ সালে জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে এসব চুক্তির কাঠামো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কমিটির মতে, অনেক বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে এমন capacity payment ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও নির্দিষ্ট সক্ষমতার জন্য অর্থ পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিছু চুক্তিতে take-or-pay ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রয়োজন না হলেও নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধের দায় তৈরি হয়েছে।
কমিটির হিসাবে, এসব চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ খাতে বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা না করলে অবশিষ্ট মেয়াদে প্রায় ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এগুলো জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির findings। তাই প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বা প্রতিটি চুক্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে—এমন সাধারণীকরণ করা ঠিক হবে না। বরং এসব চুক্তির অর্থনৈতিক কাঠামো, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের ওপর তৈরি হওয়া আর্থিক দায়ই এখন বড় তদন্তের বিষয়।
বিদ্যুৎ খাতে ৫২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাতটির আর্থিক দুর্বলতা। জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ আমদানিসহ বিদ্যুৎ খাতে মোট বকেয়া ছিল ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার কাছে গ্যাস বিল বাবদ বকেয়া ছিল প্রায় ১১ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল বাবদ বকেয়া ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।
গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর capacity ও fuel payment বাবদ বকেয়া ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা। কয়লাভিত্তিক যৌথ ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কয়লা ও capacity payment বাবদ বকেয়া ছিল প্রায় ১৫ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা।
একই সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাত শুধু উৎপাদন সংকটেই নেই; এটি একটি বড় আর্থিক চাপের মধ্যেও রয়েছে।
ভর্তুকি আছে, বিল আছে—তারপরও কেন লোকসান?
বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। CPD-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের কথা ছিল। একই সময়ে LNG আমদানির জন্যও বড় অঙ্কের সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঘাটতি এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে সরকারকে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি আমদানিতে অর্থ দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধের চাপও সামলাতে হচ্ছে।
এখানে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক— গ্রাহক বিদ্যুতের বিল দিচ্ছেন, সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ছে—তারপরও বিদ্যুৎ খাত কেন আর্থিকভাবে এত দুর্বল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি, capacity payment, জ্বালানি ব্যয়, আমদানি ব্যয়, ব্যাংকঋণ এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পুরো কাঠামো একসঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। গ্যাস না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায় গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হয়। কিন্তু এই বিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে এক পর্যায়ে HFO-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দৈনিক খরচ প্রায় ৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দৈনিক খরচ ছিল আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৩ কোটি টাকা।
অর্থাৎ গ্যাসের সংকট একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদনের খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা পড়ে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, বিদ্যুতের মূল্য এবং জনগণের অর্থের ওপর।
আমদানিনির্ভরতা কি বিদ্যুৎ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। LNG, কয়লা, ফার্নেস অয়েল এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে ২০২৫ সালে বকেয়া অর্থ পরিশোধের জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সে সময় সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।
এতে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—জাতীয় বিদ্যুৎ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো একক বিদেশি সরবরাহকারী বা সীমিত সংখ্যক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা নিরাপদ?
আদানি চুক্তি নিয়ে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রশ্ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ নিয়ে আলোচনায় আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি এই চুক্তিতে মূল্য নির্ধারণ, চুক্তির শর্ত এবং প্রক্রিয়াগত বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোড্ডা কেন্দ্রের বিদ্যুতের মূল্য অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত আমদানির তুলনায় বেশি এবং কিছু চুক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে।
সরকারি পর্যালোচনা কমিটির এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা ও পুনঃআলোচনার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের বিষয়ে চূড়ান্ত দায় বা আইনি সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করবে।
তাহলে কি মূল সমস্যা বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, পরিকল্পনায়?
বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে—কিন্তু সব কেন্দ্র চালানোর মতো জ্বালানি নেই। উৎপাদন সক্ষমতা আছে—কিন্তু তার একটি বড় অংশ পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুক্তি আছে—কিন্তু সেই চুক্তির অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারি ভর্তুকি আছে—কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া কমছে না।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো বেড়েছে—কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এখনও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। এই চিত্র ইঙ্গিত দেয়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট শুধু আজকের গ্যাস ঘাটতির ফল নয়। এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, চাহিদার পূর্বাভাস, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
দায় কার?
বর্তমান সংকটের দায় এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো তথ্যভিত্তিক হবে না। তবে গত দেড় দশকের নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে এখন কঠিন কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সময় ভবিষ্যৎ জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল?
যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তব উৎপাদন ক্ষমতা ও ব্যবহার কতটা ছিল?
বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও capacity payment দেওয়ার কাঠামো কেন তৈরি করা হয়েছিল?
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকা অবস্থায় আমদানিনির্ভর LNG ব্যবস্থার ওপর এতটা নির্ভরশীলতা কেন তৈরি হলো?
বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া এত বড় অঙ্কে পৌঁছানোর কারণ কী?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যে পরিমাণ অর্থ বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ও ব্যয় হয়েছে, তার বিনিময়ে জনগণ কি সেই মানের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সেবা পেয়েছে?
সমাধান কি শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র?
বর্তমান সংকটের সমাধান হিসেবে আরও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করাই একমাত্র পথ হতে পারে না। প্রথমে প্রয়োজন বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা নির্ধারণ করা। কোন কেন্দ্র কেন বন্ধ, কোথায় জ্বালানি সংকট, কোথায় গ্রিড সীমাবদ্ধতা এবং কোথায় আর্থিক সমস্যার কারণে উৎপাদন হচ্ছে না—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিগুলোর স্বাধীন আর্থিক ও আইনি অডিট প্রয়োজন। capacity payment এবং take-or-pay-এর মতো শর্তগুলো জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ও ব্যাংকঋণের একটি স্বচ্ছ আর্থিক চিত্র জনগণের সামনে প্রকাশ করা দরকার।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি LNG আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাকে বাস্তব চাহিদা ও নিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে সমন্বয় করা।
শেষ কথা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট একটি বড় শিক্ষা সামনে নিয়ে এসেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ালেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, সঠিক চাহিদা পূর্বাভাস, দক্ষ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং বহুমুখী জ্বালানি উৎস।
আজ ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতার দেশেও যখন হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়, গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হয় এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া জমে থাকে—তখন প্রশ্নটি শুধু ‘বিদ্যুৎ কোথায়?’ নয়।
প্রশ্নটি আরও গভীর—
বিদ্যুৎ খাতে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও বাংলাদেশ কেন একটি নির্ভরযোগ্য ও আর্থিকভাবে টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারল না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু আজকের লোডশেডিংয়ের দিকে তাকালে হবে না। খতিয়ে দেখতে হবে গত দেড় দশকের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, capacity payment, জ্বালানি আমদানি, সরকারি ভর্তুকি, BPDB-এর বকেয়া এবং বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
কারণ গ্যাস সংকট হয়তো সাময়িক। LNG টার্মিনালের সমস্যাও একসময় কেটে যাবে। কিন্তু পরিকল্পনার দুর্বলতা, অস্বচ্ছ চুক্তি এবং আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি যদি থেকে যায়, তাহলে লোডশেডিংয়ের এই চক্র বারবার ফিরে আসতে পারে।
আর শেষ পর্যন্ত সেই সংকটের মূল্য দিতে হবে দেশের মানুষকেই—বিদ্যুৎ বিল দিয়ে, কর দিয়ে এবং উৎপাদন ও কর্মঘণ্টা হারিয়ে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB), Power Grid Company of Bangladesh (PGCB), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC), Centre for Policy Dialogue (CPD), জাতীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন, Reuters, The Daily Star, BSS, bdnews24 ও The Business Standard।