মুখের দুর্গন্ধের কারণ কী? অবহেলা নয়, জেনে নিন সম্ভাব্য কারণ ও প্রতিকারের উপায়
স্বাস্থ্য ডেস্ক ||
মুখের দুর্গন্ধ বা হ্যালিটোসিস খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। অনেকেই মনে করেন, শুধু পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় মুখ পরিষ্কার না করলেই মুখে দুর্গন্ধ হয়। বাস্তবে এর পেছনে থাকতে পারে দাঁত ও মাড়ির সমস্যা, জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়া জমা, মুখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ধূমপান, কিছু ওষুধ কিংবা নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের দুর্গন্ধের বেশিরভাগ কারণই মুখগহ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু মাউথওয়াশ বা মিন্ট ব্যবহার করে সাময়িকভাবে গন্ধ ঢেকে না রেখে এর মূল কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।
১. মুখ ও দাঁত ঠিকমতো পরিষ্কার না করা
মুখের দুর্গন্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপর্যাপ্ত ওরাল হাইজিন। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ ও ফ্লস না করলে দাঁতের ফাঁকে খাবারের কণা আটকে থাকে। এসব খাদ্যকণা মুখের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভেঙে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করতে পারে।
দাঁতের ওপর ব্যাকটেরিয়ার তৈরি প্লাক জমে গেলে মাড়িতে প্রদাহও হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এটি মাড়ির রোগে রূপ নিতে পারে, যার অন্যতম লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধ।
২. জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়া জমা
অনেকেই দাঁত পরিষ্কার করলেও জিহ্বা পরিষ্কার করেন না। অথচ জিহ্বার অসমতল পৃষ্ঠে ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য পদার্থ জমে থাকতে পারে। বিশেষ করে জিহ্বার পেছনের অংশে দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে
তাই প্রতিদিন দাঁত ব্রাশের পাশাপাশি জিহ্বাও আলতোভাবে পরিষ্কার করা উপকারী।
৩. মাড়ির রোগ ও দাঁতের ক্ষয়
মাড়ি ফুলে যাওয়া, রক্ত পড়া, দাঁতে পাথর বা প্লাক জমা এবং দাঁতের ক্ষয়—এসব সমস্যার সঙ্গেও মুখের দুর্গন্ধের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের মাড়ির রোগ থাকলে দুর্গন্ধ সহজে দূর নাও হতে পারে।
এ ধরনের সমস্যা থাকলে শুধু মাউথওয়াশ ব্যবহার না করে দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৪. মুখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া
মুখের ভেতর লালা শুধু খাবার গিলতে সাহায্য করে না, এটি মুখ পরিষ্কার রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লালা কমে গেলে মুখের ভেতরে খাদ্যকণা ও ব্যাকটেরিয়া জমে দুর্গন্ধ বাড়তে পারে।
ঘুমের সময় স্বাভাবিকভাবেই লালা উৎপাদন কমে যায়। এ কারণেই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকের মুখে দুর্গন্ধ থাকে। মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, কিছু ওষুধ এবং অন্যান্য কারণে দীর্ঘস্থায়ী মুখ শুষ্কতাও হতে পারে।
৫. পেঁয়াজ, রসুন ও কিছু খাবার
কিছু খাবার খাওয়ার পর সাময়িকভাবে মুখে দুর্গন্ধ হওয়া স্বাভাবিক। পেঁয়াজ, রসুন ও ঝাল-মসলা জাতীয় খাবার এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব খাবারের কিছু উপাদান হজমের পর রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ফুসফুসে পৌঁছে নিঃশ্বাসের গন্ধেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার পর দুর্গন্ধ হলে সেটি সবসময় কোনো রোগের লক্ষণ নয়।
৬. ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য
সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্য মুখে নিজস্ব দুর্গন্ধ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি ধূমপান মুখ শুষ্ক করে এবং মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়ায়—দুইভাবেই এটি মুখের দুর্গন্ধের সমস্যা বাড়াতে পারে।
৭. টনসিল স্টোন
টনসিলের ছোট ছোট গর্তে খাবারের কণা, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য পদার্থ জমে ছোট শক্ত দলা তৈরি হতে পারে, যাকে টনসিল স্টোন বলা হয়। এসবের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া থাকায় মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হতে পারে
৮. সাইনাস, গলা ও নাকের সমস্যা
নাক ও সাইনাসের কিছু সংক্রমণ বা গলার সমস্যাও মুখের দুর্গন্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। নাক বন্ধ থাকার কারণে দীর্ঘসময় মুখ দিয়ে শ্বাস নিলে মুখ শুকিয়ে গিয়ে দুর্গন্ধ আরও বাড়তে পারে।
৯. অ্যাসিড রিফ্লাক্স
বারবার বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যার সঙ্গেও মুখের দুর্গন্ধের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধের ক্ষেত্রে শুধু গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটিকে কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়; প্রথমে মুখ ও দাঁতের সম্ভাব্য কারণগুলো পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
১০. কিছু ওষুধ ও শারীরিক সমস্যা
কিছু ওষুধ মুখ শুষ্ক করে দিতে পারে, যার ফলে দুর্গন্ধ বাড়তে পারে। আবার কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থাতেও নিঃশ্বাসের গন্ধ পরিবর্তিত হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে কিছু বিপাকীয় রোগ বা গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গেও বিশেষ ধরনের শ্বাসের গন্ধের সম্পর্ক থাকতে পারে।
তবে শুধু মুখের দুর্গন্ধ দেখে কোনো নির্দিষ্ট রোগের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
মুখের দুর্গন্ধ কমাতে যা করতে পারেন
মুখের দুর্গন্ধ কমাতে নিয়মিত ওরাল হাইজিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা-সংক্রান্ত নির্দেশনায় সাধারণত যেসব অভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় সেগুলো হলো—
* দিনে অন্তত দুইবার দুই মিনিট করে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা।
* প্রতিদিন অন্তত একবার ফ্লস বা ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার করা।
* প্রতিদিন জিহ্বা আলতোভাবে পরিষ্কার করা।
* পর্যাপ্ত পানি পান করে মুখ আর্দ্র রাখা।
* ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলা।
* অতিরিক্ত চিনি ও দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী খাবার কমানো।
* ডেন্টার, রিটেইনার বা অন্যান্য মুখের ডিভাইস থাকলে নিয়মিত পরিষ্কার করা।
* নিয়মিত দাঁতের চিকিৎসকের কাছে চেকআপ করা।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
সঠিকভাবে দাঁত ও জিহ্বা পরিষ্কার করা, ফ্লস করা এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার পরও যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে মুখের দুর্গন্ধ না কমে, তাহলে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া, দাঁতে ব্যথা, দাঁত নড়বড়ে হওয়া বা ডেন্টারের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি।
মুখের দুর্গন্ধ অনেক সময় সামান্য একটি পরিচ্ছন্নতার সমস্যা হলেও, দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি দাঁত-মাড়ির রোগ বা অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই নিয়মিত মুখ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি দুর্গন্ধের মূল কারণ শনাক্ত করাই সবচেয়ে কার্যকর
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা