ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ফের কূটনৈতিক অচলাবস্থা, আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করলেন ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অচলাবস্থার মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা বা কথোপকথন চলছে না। এমনকি ভবিষ্যতের জন্যও কোনো বৈঠক নির্ধারিত নেই।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং কোনো আলোচনা বা বৈঠকও নির্ধারিত হয়নি
আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে নানা ধরনের খবর সামনে আসছিল।
এর মাত্র একদিন আগে ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে এবং আলোচনার পরিধি বেশ সক্রিয়। তবে ইরান এমন কোনো চুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য। ফলে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিটি এখন ‘খোলা ও সচল’ রয়েছে এবং সেখানে থাকা পানির নিচের সব মাইন সরিয়ে ফেলা হয়েছে বা বিস্ফোরিত করা হয়েছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে এর বিপরীত বক্তব্য এসেছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না। তাঁর দাবির মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড় এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই জলপথে চলাচল স্বাভাবিক না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার প্রভাবে মঙ্গলবার তেলের দাম বেড়েছে এবং শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের ওপর আরও চাপ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে। ঘটনায় জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে ক্ষতি এবং একজন ক্রু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ, বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমাও শেষ হয়েছে। কিন্তু একটি বৃহত্তর শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশটি আরও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থানে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার নতুন করে বড় ধরনের হামলার খবর না এলেও কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
ট্রাম্পের ‘কোনো আলোচনা নেই’ ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আপাতত আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, ইরানের অর্থনৈতিক সম্পদ এবং মার্কিন নৌ অবরোধ—এই বিষয়গুলোতে দুই দেশের অবস্থানের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
তবে পর্দার আড়ালে যোগাযোগের কোনো চ্যানেল সক্রিয় আছে কি না, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্যও রয়েছে। ফলে প্রকাশ্য আলোচনা বন্ধ থাকলেও ভবিষ্যতে মধ্যস্থতাকারী কোনো দেশের মাধ্যমে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হয় কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, যার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
-নিউইয়র্ক ভয়েস বাংলা