বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে গেলে ভারতের এত ভয় কেন?
মোঃ নাজমুল হাসান বাবু,
সম্পাদকীয়॥
বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে গেলে ভারতের এত ভয় কেন?
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র—এটা সত্য। কিন্তু প্রতিবেশী হলেই যে সবসময় বাংলাদেশের স্বার্থ ভারতের স্বার্থের সঙ্গে এক হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশ মনে করে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক সময় সমতার জায়গা থেকে নয়, বরং চাপ ও নির্ভরতার জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
এখন বাংলাদেশ যখন নিজের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থে নতুনভাবে ভাবছে, তখন সামনে এসেছে মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টি। আর এই জায়গাতেই ভারতের অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য নতুন কোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্ত হতে চায়, তাহলে ভারতের এত চিন্তা কেন?
এই জোটে রয়েছে পাকিস্তান। ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর একটি পাকিস্তান। পাকিস্তান শুধু একটি সামরিক শক্তিধর দেশ নয়, এটি একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। একই কাঠামোয় রয়েছে সৌদি আরব এবং তুরস্ক—যে তুরস্ক গত কয়েক বছরে ড্রোন প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সামরিক সক্ষমতায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
এখন একটু হিসাব করে দেখুন।
বাংলাদেশ যদি এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের সামনে থাকবে পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা, তুরস্কের আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও ড্রোন সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি।
তাহলে কি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা আগের চেয়ে শক্তিশালী হবে না?
আর যদি বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়বে কে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
ভারত ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য এই পদক্ষেপকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এমন কোনো সিদ্ধান্ত যা ভারতের নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে।
অর্থাৎ ভারতের উদ্বেগ যে আছে, সেটি এখন আর কেবল অনুমানের বিষয় নয়।কিন্তু আমার প্রশ্ন আরও সরাসরি—
বাংলাদেশ কি তার নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত ভারতের পছন্দ অনুযায়ী নেবে?
বাংলাদেশ কি কার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করবে, সেটাও কি দিল্লির অনুমতি নিয়ে করতে হবে?
আমি মনে করি, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় অংশীদার বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
এখানে আরেকটি বিষয়ও সামনে আসে। বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাব নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ইসকনকে ঘিরে বাংলাদেশে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিও এখন মানুষের আলোচনার বাইরে নয়।
অনেকের অভিযোগ—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এতে ভারতের স্বার্থ কাজ করছে।
আমি এই অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বলছি না। কিন্তু প্রশ্নটা অবশ্যই করা যায়—
বাংলাদেশের ভেতরের কোনো ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক ইস্যু যদি দেশের স্থিতিশীলতা দুর্বল করে, তাহলে তার সুবিধা কার?
আর বাংলাদেশ যখন নতুন করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করার কথা ভাবছে, তখন সেই সম্পর্ক ঠেকাতে কোনো পক্ষের স্বার্থ আছে কি না—সেটিও বাংলাদেশের মানুষের জানার অধিকার রয়েছে।
কারণ বিষয়টি শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রশ্ন নয়।এটি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতার প্রশ্ন।
এতদিন যদি বাংলাদেশকে বলা হয়ে থাকে—এই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো যাবে, ওই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো যাবে না; এই সামরিক সরঞ্জাম কেনা যাবে, ওই জায়গা থেকে কেনা যাবে না—তাহলে সেটা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে না।
বাংলাদেশের উচিত হবে—ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে এবং একই সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গেও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকবে।
বাংলাদেশ কারও শত্রু হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ কারও অধীনও থাকবে না।এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা।
আর ভারত যদি মনে করে, বাংলাদেশের নতুন কোনো প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ, তাহলে ভারতের সেই উদ্বেগ ভারতকে সামলাতে হবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ভারতের নয়—বাংলাদেশের নিজের।
তাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—
বাংলাদেশ কি নিজের জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-হিসাব বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে?
আমার কাছে উত্তরটি খুব পরিষ্কার।
বাংলাদেশকে তার নিজের স্বার্থ দেখতে হবে।কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।