চাঁদের ৯৬ শতাংশ ঢেকে যাবে পৃথিবীর ছায়ায়, ২৭–২৮ আগস্ট আকাশে গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
আগামী বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত থেকে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোর পর্যন্ত আকাশে দেখা যাবে বছরের অন্যতম আকর্ষণীয় মহাজাগতিক দৃশ্য—একটি গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ। এ সময় পৃথিবীর অন্ধকার কেন্দ্রীয় ছায়া বা ‘আমব্রা’ চাঁদের প্রায় ৯৬ শতাংশ অংশ ঢেকে ফেলবে। ফলে পূর্ণগ্রহণ না হলেও চাঁদের বড় অংশে তামাটে বা লালচে আভা দেখা দিতে পারে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) জানিয়েছে, ২৭ আগস্টের রাত থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত এই আংশিক চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে চাঁদের প্রায় ৯৬.৩ শতাংশ অংশ পৃথিবীর আমব্রার মধ্যে থাকবে।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় পুরো চাঁদই ছায়ায়
নাসার তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী (UTC) গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় হবে ২৮ আগস্ট ভোর ৪টা ১৩ মিনিটের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন ডে-লাইট টাইমে (EDT) এটি হবে ২৭ আগস্ট রাত ১২টা ১৩ মিনিটের দিকে।
তবে স্থানীয় সময় অনুযায়ী গ্রহণের সময় ভিন্ন হবে। উদাহরণ হিসেবে,
-নিউইয়র্কে গ্রহণের উপচ্ছায়া পর্ব শুরু হবে ২৭ আগস্ট রাত ৯টা ২৩ মিনিটে, আংশিক গ্রহণ শুরু হবে রাত ১০টা ৩৪ মিনিটে, সর্বোচ্চ পর্যায় হবে ২৮ আগস্ট রাত ১২টা ১৩ মিনিটে এবং আংশিক গ্রহণ শেষ হবে রাত ১টা ৫২ মিনিটের দিকে। পুরো উপচ্ছায়া পর্ব শেষ হবে ভোর ৩টা ২ মিনিটের দিকে।
পুরো গ্রহণপর্ব—উপচ্ছায়া থেকে উপচ্ছায়া পর্যন্ত—প্রায় ৫ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট স্থায়ী হবে। এর মধ্যে প্রকৃত আংশিক গ্রহণের সময় প্রায় ৩ ঘণ্টা ১৮ মিনিট।
কেন চাঁদ লালচে দেখাতে পারে?
চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ এমনভাবে অবস্থান করে যে পৃথিবী সূর্যের আলোকে আংশিক বা পুরোপুরি চাঁদের দিকে পৌঁছাতে বাধা দেয়। আংশিক চন্দ্রগ্রহণে চাঁদের একটি অংশ পৃথিবীর গাঢ় ছায়া বা আমব্রার মধ্যে প্রবেশ করে, আর অন্য অংশ সরাসরি সূর্যের আলো পেতে থাকে।
গ্রহণের সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে কিছু সূর্যালোক বেঁকে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছায়। বায়ুমণ্ডল নীল ও বেগুনি আলোর তুলনায় লাল ও কমলা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বেশি দূর পর্যন্ত যেতে দেয়। এ কারণেই গ্রহণের ছায়ায় থাকা চাঁদের অংশে তামাটে, কমলা বা লালচে আভা দেখা দিতে পারে।
তবে এটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ নয়। চাঁদের একটি সরু অংশ পৃথিবীর গাঢ় ছায়ার বাইরে থাকবে। তাই একে অনেক সময় ‘প্রায় পূর্ণ’ বা ‘near-total’ ধরনের দৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করা হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি আংশিক চন্দ্রগ্রহণই।
কোথা থেকে দেখা যাবে?
নাসার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই চন্দ্রগ্রহণের দৃশ্য উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বড় অংশ, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অঞ্চল থেকে দেখা যাবে। সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকবে আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন এলাকা।
Timeanddate-এর হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৩.৩৪ বিলিয়ন মানুষ গ্রহণের অন্তত আংশিক পর্যায় দেখতে সক্ষম হতে পারেন, আর প্রায় ৯৮৭ মিলিয়ন মানুষ পুরো গ্রহণপর্ব দেখার সুযোগ পাবেন—অবশ্যই স্থানীয় আবহাওয়া ও আকাশ পরিষ্কার থাকার ওপর দৃশ্যমানতা নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ থেকে দেখা যাবে না
বাংলাদেশের আকাশপ্রেমীদের জন্য অবশ্য রয়েছে হতাশার খবর। ২৮ আগস্টের এই আংশিক চন্দ্রগ্রহণ বাংলাদেশ থেকে দৃশ্যমান হবে না। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরও ২৮ আগস্টের আংশিক চন্দ্রগ্রহণের তথ্য প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী, গ্রহণের সময় বাংলাদেশে চাঁদ দিগন্তের নিচে থাকবে। ফলে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থান থেকে গ্রহণের আংশিক বা পূর্ণ পর্যায় চোখে পড়বে না।
-বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় পড়বে ২৮ আগস্ট সকাল প্রায় ১০টা ১৩ মিনিটে—যখন বাংলাদেশে দিনের আলো এবং চাঁদ দিগন্তের নিচে অবস্থান করবে।
খালি চোখেই দেখা নিরাপদ
চন্দ্রগ্রহণ পর্যবেক্ষণের জন্য সূর্যগ্রহণের মতো বিশেষ সুরক্ষাচশমার প্রয়োজন নেই। আকাশ পরিষ্কার থাকলে খালি চোখেই চন্দ্রগ্রহণ দেখা নিরাপদ। তবে দূরবীন বা ছোট টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে পৃথিবীর ছায়া কীভাবে ধীরে ধীরে চাঁদের ওপর এগিয়ে যাচ্ছে, তা আরও স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে।
আবহাওয়া পরিষ্কার থাকা এবং শহরের অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো থেকে দূরে থাকা পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা আরও ভালো করতে পারে। আলোকদূষণ কম এমন স্থান থেকে চাঁদের পরিবর্তিত রং ও ছায়ার অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট দেখা যাবে।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ
আগস্টের এই মহাজাগতিক ঘটনা ২০২৬ সালের দ্বিতীয় এবং শেষ চন্দ্রগ্রহণ। এর আগে ৩ মার্চ ২০২৬ একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হয়েছিল। NASA-এর ভবিষ্যৎ গ্রহণ তালিকা অনুযায়ী, পরবর্তী চন্দ্রগ্রহণ হবে ২০–২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৭, যা হবে একটি উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ।
২৭–২৮ আগস্টের ঘটনাটি বিশেষ আকর্ষণীয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো—এটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণে পরিণত হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছাবে। চাঁদের মাত্র একটি ছোট অংশ গাঢ় ছায়ার বাইরে থাকবে। ফলে পৃথিবীর যেসব অঞ্চল থেকে পুরো ঘটনাটি দেখা যাবে, সেখানকার আকাশপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে বছরের স্মরণীয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দৃশ্যগুলোর একটি।