কলমের মর্যাদা বিকিয়ে গেলে, সাংবাদিকতা হারায় বিশ্বাসযোগ্যতা
বসুরহাট বাইপাসে অনুমোদনহীন মেলার উদ্বোধন প্রচার নিয়ে প্রশ্ন; জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থের সাংবাদিকতা কতটা নৈতিক?
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সত্য প্রকাশের সাহস এবং মানুষের অধিকার রক্ষার এক মহান অঙ্গীকার। অথচ দুঃখজনকভাবে, কিছু ব্যক্তি এই মহান পেশাকে ব্যক্তিস্বার্থ, সামান্য আর্থিক সুবিধা, সস্তা জনপ্রিয়তা কিংবা চটকদার প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত করছেন। তাঁদের কাছে মানুষের দুর্ভোগ, জনস্বার্থের সংকট, প্রশাসনিক অনিয়ম কিংবা সামাজিক অসংগতি যেন তেমন গুরুত্ব পায় না। বরং যেখানে ব্যক্তিগত সুবিধা রয়েছে, সেখানেই তাঁদের কলম ও ক্যামেরার সরব উপস্থিতি দেখা যায়।
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট বাইপাস সড়কে সম্প্রতি একটি মেলার উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে এমনই কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। স্থানীয়ভাবে মেলার আয়োজন ও উদ্বোধনী প্রচার ঘিরে জনমনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। মেলাটি আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। যদি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রশাসনিক বৈধতা ছাড়াই এ আয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই তদন্ত করে দেখার বিষয়।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, মেলার বৈধতা, নিরাপত্তাব্যবস্থা, জনদুর্ভোগ, যান চলাচলে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলো সামনে আনার পরিবর্তে কিছু সংবাদকর্মীকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ফিতা কাটার প্রচারে বেশি আগ্রহী দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সাংবাদিকতার দায়িত্ব কি কেবল কোনো আয়োজনের প্রচার করা, নাকি আয়োজনটির বৈধতা ও জনস্বার্থের বিষয়গুলোও অনুসন্ধান করা?
কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেলা আয়োজন করতে পারেন, সেটি নিজস্ব বিষয়। কিন্তু জনসমাগম, সড়ক ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত থাকলে প্রশাসনিক নিয়মকানুন মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। আর সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো, কোনো পক্ষের প্রচারক না হয়ে এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর খুঁজে বের করা।
সাংবাদিকতা কখনো কারও ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হতে পারে না। সামান্য আর্থিক সুবিধা, উপঢৌকন কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সংবাদ পরিবেশনের নীতি ও নিরপেক্ষতা বিসর্জন দেওয়া হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সাংবাদিক সমাজ। তখন সংবাদ আর জনস্বার্থের আয়না থাকে না; হয়ে ওঠে কারও স্বার্থ রক্ষার বিজ্ঞাপন।
অবশ্য কোনো অনুষ্ঠান সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ করা বা উদ্বোধনের খবর প্রচার করাই অনৈতিকতার প্রমাণ নয়। তবে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য।
আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। যাঁরা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় করেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো প্রমাণ ছাড়াই কাউকে অসৎ আখ্যা দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। অভিযোগ থাকলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তা প্রকাশ করতে হবে।
সচেতন নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক সংগঠন এবং প্রকৃত পেশাদার সংবাদকর্মীদের দায়িত্ব হলো সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড রক্ষা করা। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রচার নয়, মানুষের অধিকার ও জনস্বার্থই হোক সংবাদ পরিবেশনের প্রধান বিবেচনা।
মনে রাখতে হবে, সংবাদপত্রের শক্তি তার শিরোনামের চমকে নয়, সত্য প্রকাশের সাহসে। ক্যামেরার মূল্য তার চাকচিক্যে নয়, অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরার সক্ষমতায়। আর কলমের মর্যাদা অর্থের বিনিময়ে নয়, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতায়।
কারণ, সাংবাদিকের কলম যখন জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থের কাছে নত হয়, তখন শুধু সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন হয় না; অন্ধকারে হারিয়ে যায় সত্য জানার মানুষের অধিকারও।