Columbus, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিজ্ঞাপন 728 × 90
সর্বশেষ খবর
ইউরোপে AI শক্তির নতুন দিগন্ত, ৪৪৯ মিলিয়ন ডলারে তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক সুপারকম্পিউটার পুতিন-শি বৈঠক: আরও শক্তিশালী রাশিয়া-চীন সম্পর্কের বার্তা, বিশকেকে SCO সম্মেলন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশে একাধিক পদে নিয়োগ, আবেদন শেষ হচ্ছে ১ ও ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে ‘দেশের প্রথম’ রোবোটিক সার্জারি, একদিনে দুই রোগীর অস্ত্রোপচার ঢাবির তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠন, সাময়িক বরখাস্ত বার্সেলোনার হ্যাটট্রিক জয়, জোড়া গোল হাফিনিয়া-ইয়ামালের ৪৮ বছরে বিএনপি: সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ পথচলা আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি গরমে বাড়ছে পোষা প্রাণীর flea সংক্রমণের ঝুঁকি, সতর্ক থাকার পরামর্শ নেপালের বন্যাদুর্গতদের জন্য ১০ কোটি ওন দান করলেন Stray Kids-এর Lee Know মিস ওয়ার্ল্ডের ‘Beauty With a Purpose’ সেগমেন্টে সেরা ২৪-এ বাংলাদেশের সামানজার ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ১৪ মার্চ, সময় আর পেছাবে না জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দিতে চাই: তারেক রহমান সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল অনুমোদন, সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে গেলে ভারতের এত ভয় কেন?
হোম জাতীয় ৪৮ বছরে বিএনপি: সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ পথচলা

৪৮ বছরে বিএনপি: সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ পথচলা

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০:৪৪ পিএম, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ 28
৪৮ বছরে বিএনপি: সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ পথচলা

মো: নাজমুল হাসান বাবু॥

সম্পাদকীয়॥


১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা হয়।


প্রতিষ্ঠার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটির উল্লেখযোগ্য সাফল্য তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দলটিকে মুখোমুখি হতে হয় এক গভীর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের।


১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান নিহত হন। প্রতিষ্ঠাতাকে হারিয়ে দলটি কঠিন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়লেও বিএনপি ভেঙে পড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের অধীনে দলটি পুনর্গঠিত হতে থাকে।


এই কঠিন সময়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি দলের নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।


এরশাদবিরোধী আন্দোলন: গণতন্ত্রের জন্য রাজপথের সংগ্রাম

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথে আন্দোলন, মিছিল, হরতাল ও গণসংযোগের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো করে।


১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন রাজপথে সক্রিয় হয়। ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়েন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়।


এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃঢ়চেতা ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।


১৯৯১: রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ও সংসদীয় গণতন্ত্র

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।


এই সময় বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায় বাংলাদেশ। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষার বিস্তার এবং গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগও এই সময়ের আলোচিত বিষয়।


বিএনপির সমর্থকদের কাছে ১৯৯১-এর সরকার ছিল গণতান্ত্রিক ধারায় বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।


১৯৯৬ থেকে ২০০১: বিরোধী রাজনীতি ও আবার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন

১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপি বিরোধী দলে যায়। ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটি আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়।


এরপর আসে ২০০১ সালের নির্বাচন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে বড় বিজয় অর্জন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।


এই সরকারের সময় যোগাযোগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, কৃষি ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ওই সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো গুরুতর ঘটনাগুলোও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।


অর্থাৎ বিএনপির ইতিহাস যেমন অর্জন ও সাফল্যের, তেমনি সমালোচনা ও বিতর্কের অধ্যায়ও এর সঙ্গে যুক্ত। একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক মূল্যায়নে দুই দিকই ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক।


১/১১: বিএনপির জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি

২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা বিএনপির জন্য নতুন এক কঠিন অধ্যায়ের সূচনা করে। জরুরি অবস্থার মধ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বসহ বহু নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হন।


এই সময় বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানও গ্রেপ্তার হন। কারাবন্দি অবস্থায় তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন—এমন অভিযোগ বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে। সমসাময়িক প্রতিবেদনে তাঁর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে।


পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর তারেক রহমান দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দীর্ঘ প্রবাসজীবন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।


শারীরিকভাবে দেশের বাইরে থাকলেও তিনি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। সময়ের সঙ্গে দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং পরবর্তীতে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।


খালেদা জিয়ার কারাবাস ও দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা

বিএনপির জন্য পরবর্তী বছরগুলোও ছিল কঠিন। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাস দলটির রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।


২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাবাস বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিএনপি এসব মামলাকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও দীর্ঘ সময় তিনি রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন।


একদিকে দলের চেয়ারপারসনের কারাবাস, অন্যদিকে দলের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের দীর্ঘ প্রবাসজীবন—সব মিলিয়ে বিএনপির জন্য সময়টি ছিল রাজনৈতিক টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা।


২০২৪: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও বিএনপির ভূমিকা

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন এবং জনঅসন্তোষের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে বাংলাদেশে যে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মোড় সৃষ্টি করে।


এই আন্দোলনের সূচনা ও নেতৃত্বে ছিল ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয় সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। আন্দোলন ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসে।


এই আন্দোলনে বিএনপিরও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অংশগ্রহণ ছিল। বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদেরও নিহত, আহত, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়।


বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর হিসাবে, জুলাই–আগস্টের আন্দোলনে তাদের বহু নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজারো নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিএনপির যুব ও ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের নিহত ও আহত নেতাকর্মীদের উল্লেখ করে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে। একই প্রতিবেদনে এটিও বলা হয়েছে যে, এই বিজয় ছিল রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ফল।


এখানেই এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি—এটি কোনো একক দল বা সংগঠনের একক অর্জন ছিল না। ছাত্রদের নেতৃত্ব, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির রাজপথের ভূমিকা মিলেই আন্দোলনটি একটি ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়।


বিএনপির দৃষ্টিতে, দীর্ঘদিনের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। আর ছাত্র-জনতার সাহসী অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ সেই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। ফলে ২০২৪-এর ইতিহাসকে যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে হলে ছাত্র, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত ভূমিকা স্বীকার করাই অধিক যুক্তিসংগত।


খালেদা জিয়ার বিদায়: একটি রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবাস ও অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির জন্য এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে।


প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে থাকা এই নেত্রীর মৃত্যু বিএনপির ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটায়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নানা বিতর্কও ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির গতিপথে তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।


২০২৬: আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার পর ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি আবারও জনগণের ভোটে বড় বিজয় অর্জন করে।


আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ২১০টি আসন লাভ করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং তাঁর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।


এর মধ্য দিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করে।


একদিকে এটি বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি বড় প্রত্যাবর্তন; অন্যদিকে এটি দলটির জন্য একটি নতুন পরীক্ষা—কারণ বিরোধী দলে থেকে সরকারের সমালোচনা করা আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা এক বিষয় নয়।


৪৮ বছরের ইতিহাস: সংগ্রাম থেকে দায়িত্বের পথে

প্রায় পাঁচ দশকের বিএনপির ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠা, তাঁর শাহাদাতের পর কঠিন সময় অতিক্রম, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দল পুনর্গঠন, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, ২০০১ সালে আবার সরকার গঠন, দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, ১/১১-পরবর্তী দমন-পীড়ন, তারেক রহমানের গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ লন্ডন প্রবাস, খালেদা জিয়ার কারাবাস, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ এবং অবশেষে ২০২৬ সালে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে বিএনপির পথচলা নানা চড়াই-উতরাইয়ে পূর্ণ।


সমর্থকদের কাছে এটি সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস। সমালোচকদের কাছে দলটির শাসনামল ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন অধ্যায় প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু মতপার্থক্য যাই থাকুক, বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি যে একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি—তা অস্বীকার করা কঠিন।


সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসে বিএনপির সামনে তাই অতীতের সাফল্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতের দায়িত্বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসে দলটির সামনে এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।


কারণ একটি রাজনৈতিক দল কতবার ক্ষমতায় এসেছে—ইতিহাসের চূড়ান্ত বিচারে সেটিই তার সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়। জনগণের অধিকার কতটা নিশ্চিত হয়েছে, মানুষ কতটা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পেরেছে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হয়েছে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি কতটা নিশ্চিত হয়েছে—শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি সরকারের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করে।


শেষ কথা

৪৮ বছরের বিএনপি তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ অভিযাত্রার গল্প—প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্ব, রাষ্ট্রক্ষমতা, আন্দোলন, কারাবাস, নির্বাসন, আত্মত্যাগ, সংকট, প্রত্যাবর্তন এবং নতুন প্রত্যাশার গল্প।


শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে যে রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল, বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম ও নেতৃত্বে যে দল বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই দল আজ আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে।


এখন ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লেখার পালা।


৪৮ বছরের সংগ্রামের সবচেয়ে বড় অর্জন হবে তখনই, যখন বিএনপি ক্ষমতাকে শুধু রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে নয়, জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, উন্নয়ন ও বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।


৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির প্রতি তাই প্রত্যাশা একটাই—অতীতের সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা।