বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: বন্ধুত্ব চাই, আধিপত্য নয়
মো. নাজমুল হাসান বাবু ॥
বাংলাদেশ ও ভারত—দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের আবেগ। তাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। কিন্তু সেই সম্পর্ক কখনোই এমন হতে পারে না, যেখানে একজনের স্বার্থ বড় আর অন্যজনের স্বার্থ গৌণ হয়ে যায়।
আমার দৃষ্টিতে, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটিকে কেবল একটি সফর হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। এর মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতও রয়েছে। বাংলাদেশ এখন এমন একটি সম্পর্কের কথা বলতে চাইছে, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে থাকবে জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের অগ্রাধিকার।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে অনেক সময় ‘বন্ধুত্বের’ দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় অংশের প্রশ্ন ছিল—এই বন্ধুত্বের বাস্তব সুফল বাংলাদেশ কতটা পেয়েছে? সীমান্তে প্রাণহানি, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
বাংলাদেশ ভারতের বৈধ স্বার্থকে সম্মান করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের ভূখণ্ড, বাজার, নদীর পানি, নিরাপত্তা কিংবা কৌশলগত অবস্থান কোনো দেশের একতরফা সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হতে পারে না। একইভাবে ভারতকেও বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও জনগণের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তাই বর্তমান সরকারের ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টাকে আমি ভারতবিরোধী অবস্থান হিসেবে দেখি না। বরং এটি হওয়া উচিত সমতার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগ। এমন সম্পর্ক, যেখানে ঢাকা দিল্লির দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে না; বরং দুই দেশ আলোচনার টেবিলে বসবে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে।
তারেক রহমানের ভারত সফর শেষ পর্যন্ত হোক বা না হোক, মূল প্রশ্নটি সফর নয়—মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থের জায়গায় কতটা দৃঢ় থাকতে পারছে।
আমরা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। সহযোগিতা চাই। শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাই। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের ভিত্তি হতে হবে সম্মান ও সমতা।
বাংলাদেশ কারও প্রতিপক্ষ হতে চায় না; তবে বাংলাদেশ কারও অধীনও হতে চায় না।