কোম্পানীগঞ্জে সমস্যার শেষ নেই, উদ্যোগেরও কমতি নেই—তবু সমাধান কোথায়?
মোহাম্মদ উল্যা,
বিশেষ প্রতিনিধি॥
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে মাদক, কিশোরগ্যাং, ইভটিজিং, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, অবৈধ বালু উত্তোলন, যানজট, জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নানা সমস্যা নিয়ে একের পর এক সভা, বৈঠক ও আলোচনা হচ্ছে। নেওয়া হচ্ছে সিদ্ধান্ত, কোথাও কোথাও পরিচালিত হচ্ছে অভিযানও। কিন্তু স্থানীয়দের বড় প্রশ্ন—এসব উদ্যোগের স্থায়ী ও দৃশ্যমান ফল কোথায়?
কোম্পানীগঞ্জে সমস্যা চিহ্নিত করতে খুব একটা ঘাটতি নেই। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকবিরোধী সমাবেশ ও র্যালিও হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘটনাও রয়েছে। (CorruptionBD)
তারপরও স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অভিযান বা উদ্যোগ সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও নিয়মিত তদারকি ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসে।
খাল দখল-ভরাটে সংকুচিত জলপ্রবাহ
পৌর এলাকার বিভিন্ন খাল দখল ও ভরাটের কারণে জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ অনেক জায়গায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নালা-নর্দমার নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে নাগরিকদের অভিযোগ।
অলিগলি, ফুটপাত ও বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার কারণে পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে জনদুর্ভোগ। ডাস্টবিন নিয়মিত পরিষ্কার না হলে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধ ও ময়লার স্তূপ। কোথাও জমে থাকা পানি ও পলিথিন মশার প্রজননস্থল তৈরি করছে—যা ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
ভাঙাচোরা সড়ক, বাড়ছে যানজট
কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন সড়কের অবস্থাও নাগরিকদের জন্য উদ্বেগের কারণ। কোথাও খানাখন্দ, কোথাও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কের বেহাল দশা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজট। ফুটপাতের বড় অংশ হকারদের দখলে থাকায় পথচারীদের অনেক সময় মূল সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে। আবার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিএনজি ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফলে সাধারণ যানবাহনের পাশাপাশি বাস, ট্রাক এবং জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদক ও কিশোরগ্যাং নিয়ে উদ্বেগ
মাদক, ইভটিজিং ও কিশোরগ্যাং নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। গত আগস্টেও কোম্পানীগঞ্জ থানার উদ্যোগে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে মাদকবিরোধী সমাবেশ ও র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। (CorruptionBD)
তবে শুধু সভা কিংবা র্যালি নয়—মাদক সরবরাহের উৎস শনাক্ত, ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং তরুণদের জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয়দের ভাষায়, একসময় দুধওয়ালারা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে দুধ পৌঁছে দিতেন; এখন মাদকও যেন অনেকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই প্রয়োজন হলেও অভিযোগটির সামাজিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
চুরি-ছিনতাই ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন
চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ নিয়ে সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতেও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা উঠে এসেছে। (Prothom Alo)
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি নিয়মিত টহল, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, সিসিটিভি নজরদারি এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
চাঁদাবাজি ও সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ তদন্তের দাবি
চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ রয়েছে। একই সঙ্গে অল্প সময়ে কারও কারও অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়েও নানা আলোচনা রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।
তবে এসব অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বালু উত্তোলন: অভিযান হচ্ছে, প্রশ্ন স্থায়িত্ব নিয়ে
অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন নিয়েও কোম্পানীগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একাধিক অভিযান পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়। চলতি বছরের শুরুতে উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধে মামলা, জরিমানা ও কারাদণ্ডের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। (Noakhali Times)
এমনকি আগস্টের শেষ দিকেও কোম্পানীগঞ্জে বালুভর্তি ১৪টি ট্রাক আটকের খবর প্রকাশিত হয়েছে। (দেশ সময়)
এতে প্রশ্ন উঠছে—অভিযান হচ্ছে, জরিমানাও হচ্ছে; কিন্তু অবৈধ কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে কি?
জনগণের প্রশ্ন—সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন কোথায়?
কোম্পানীগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত এটাই—সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব কে নেবে এবং তার তদারকি করবে কে?
একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়া কিংবা একটি অভিযান পরিচালনা করা কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জবাবদিহি।
কারণ কোনো উদ্যোগ কয়েক দিন চলার পর বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। বরং জনগণের মধ্যে তৈরি হয় অবিশ্বাস ও হতাশা।
কোম্পানীগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা
নিরাপদ সড়ক, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কার্যকর ড্রেনেজ, যানজটমুক্ত চলাচল, মাদকমুক্ত সমাজ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ—এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়; নাগরিকদের মৌলিক প্রত্যাশা।
কোম্পানীগঞ্জের উন্নয়ন শুধু সভা, সিদ্ধান্ত, প্রকল্প কিংবা উদ্বোধনের ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেই সিদ্ধান্তের বাস্তব ফল মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হওয়াই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
সভা আরও হতে পারে, সিদ্ধান্তও আরও আসতে পারে। কিন্তু এবার প্রয়োজন সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন—কারণ কোম্পানীগঞ্জবাসী আর শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চান।