নিষিদ্ধ সংগঠনের সহিংস তৎপরতা—রাষ্ট্রের সক্ষমতা কোথায়?
মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বাবু
সম্পাদকীয় মতামত॥
বাংলাদেশ আবারও এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন এবং বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতার ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। রাতের শহরে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ, রাস্তায় আগুন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা—সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও যদি সেই সংগঠনের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটতে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?
আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে তাদের কোনো অংশ যদি গোপনে বা প্রকাশ্যে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করে, তাহলে তা মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর হতে হবে। নিষেধাজ্ঞা কাগজে থাকলেই হবে না; তার বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।
তবে একই সঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি—দেশের কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ বা অগ্নিসংযোগ ঘটলেই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সরাসরি দায়ী করা যায় না। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হতে হবে, অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন তদন্তের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।
কিন্তু সরকারের দায়িত্বের জায়গাটি এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা যেমন জরুরি, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘটনা ঘটার আগেই নাশকতার পরিকল্পনা শনাক্ত করে তা প্রতিহত করা। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সম্ভাব্য নাশকতার ঝুঁকি চিহ্নিত করা, বিস্ফোরক কোথা থেকে আসছে তা অনুসন্ধান করা এবং অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া—এসবই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য খুবই গভীর একটি অধ্যায়। সেই সময়ের সংঘাত, প্রাণহানি, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর চাপ এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখনো মানুষের স্মৃতিতে তাজা। সেই অভিজ্ঞতার পরও যদি দেশে আবার সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—আমরা কি সত্যিই সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছি?
আজ বিএনপির সামনেও একটি বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর তারা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসেছে। ফলে তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও বেশি। দলের ভেতরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। কোনো রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যেন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত না করে, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার।
সরকারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জনগণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে দীর্ঘ বক্তব্যের চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে কার্যকর ফলাফল। মানুষ চায় নিরাপদে রাস্তায় চলতে, গণপরিবহনে উঠতে এবং রাতে নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরতে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ তাই শুধু ঘটনার পর সংবাদ সম্মেলন করা নয়। কোথায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, কারা সংগঠিত হচ্ছে, কোথা থেকে অর্থ বা বিস্ফোরক আসছে, কারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা থাকা দরকার।
আরেকটি বিষয়ও ভুলে গেলে চলবে না। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নানা বক্তব্য ও আলোচনা চলছে। তারা দেশে ফিরবেন কি না, কবে ফিরবেন কিংবা ভবিষ্যতে কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে।
কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, বাংলাদেশের মানুষ আর সহিংসতা দেখতে চায় না। তারা রাজনৈতিক প্রতিশোধ চায় না, তারা চায় আইনের শাসন। তারা চায় অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হোক।
কারণ ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ কোনো রাজনৈতিক দলের ঘরে গিয়ে পৌঁছায় না—এটি পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের ঘরে। বাসে আগুন দিলে কোনো নেতা আহত হন না, আহত হন সাধারণ যাত্রী। রাস্তায় বিস্ফোরণ ঘটলে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, মানুষের জীবনই প্রথম ঝুঁকিতে পড়ে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন উত্তেজনা কমানো এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা। সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সক্ষমতা দেখাতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
জুলাই-আগস্টের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কারও জন্যই কাম্য নয়।
বাংলাদেশ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ সাধারণ মানুষের দেশ। তাই ক্ষমতার লড়াই, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সাংগঠনিক আধিপত্যের চেয়ে মানুষের নিরাপত্তা এবং দেশের স্থিতিশীলতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের শক্তি ককটেলের জবাব ককটেল দিয়ে নয়—আইন, তদন্ত, বিচার এবং জনগণের আস্থা দিয়ে।
বাংলাদেশকে আবার এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে ফিরতে হবে, যেখানে মতের পার্থক্য থাকবে, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো পক্ষই খেলবে না।
— সম্পাদকীয় বিভাগ