প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদের পর মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করলেন তারা, আর্তনাদে কাতর পরিবার
সম্পর্কে তারা ছিলেন মামাতো-ফুপাতো ভাইবোন। ভালোবেসেছিলেন পরস্পরকে। তারপর বিয়ে। আড়াই-তিনমাস সংসার করার পর হঠাৎ পারিবারিক চাপে বিচ্ছেদ। এই বিচ্ছেদের ২৫ দিনের মাথায় মাত্র আট- নয় ঘণ্টার ব্যবধানে মারা গেলেন দুজনই।
মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটেছে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে। মৃত দুজন হলেন উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের আটবাড়ি গ্রামের মো. সাকিব মিয়া (২৩) ও তার সাবেক স্ত্রী তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের মুক্তা আক্তার (১৯)। পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে আটবাড়ি গ্রামে নিজ ঘরের বারান্দা থেকে সাকিবের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের দিন সোমবার সন্ধ্যায় শ্রীপুরে ফাঁস দিয়ে মারা যান মুক্তা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সাকিব আটবাড়ি গ্রামের সুনো মিয়ার ছেলে। দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার স্ত্রী ও আড়াই বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। তার স্ত্রী বর্তমানে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এর মধ্যে প্রায় তিন মাস আগে মামাতো বোন মুক্তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর গোপনে বিয়ে করেন সাকিব। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে পরিবারিক কলহ শুরু হয়। একপর্যায়ে পারিবারিক চাপে ২০ থেকে ২৫ দিন আগে মুক্তাকে তালাক দেন তিনি। এরপর মুক্তা বাবার কর্মস্থলের বাসা গাজীপুরের শ্রীপুরে চলে যান।
পুলিশ জানায়, সোমবার সন্ধ্যায় শ্রীপুরে গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যান মুক্তা। পরে তার বাবা বাবুল মিয়া স্থানীয় পুলিশকে না জানিয়ে মেয়ের মরদেহ নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেতুলিয়া ইউনিয়নের ফাগুয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানে দাফনের প্রস্তুতি চলছিল। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
এদিকে সাবেক স্ত্রী মুক্তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মঙ্গলবার সকালে ঘরের বারান্দায় সাকিবকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান স্বজনরা। স্থানীয়দের ধারণা পারিবারিক চাপে বিচ্ছেদের পর দুজনের জীবনে প্রচন্ড হতাশা নেমে আসে। তীব্র মানসিক চাপ ও অস্থিরতা থেকেই এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে জানান তারা।
মর্মান্তিক এ ঘটনায় নিহত দুজনের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে আলামত দেখে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে, এমনটাই জানান মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন করা মোহনগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রবিউল আওয়াল।
পুলিশ ধারণা করছে, বিচ্ছেদের কারণে হতাশা থেকে সাকিব এমনটি করে থাকতে পারেন। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছেনা।
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, শ্রীপুরে বাবার কাছে থাকাকালে মুক্তা গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যান। ঝামেলার আশঙ্কায় তার বাবা সেখানকার পুলিশকে না জানিয়ে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। আর মঙ্গলবার সকালে সাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, দুজনের মরদেহ প্রথমে থানায় আনা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো নেত্রকোণা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুটি ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এই মৃত্যুর ঘটনা বর্তমানে মোহনগঞ্জ উপজেলায় টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে৷ নিহত ব্যক্তিদের পরিবারে শোকের মাতম বইছে। শোক ছুঁয়েছে স্থানীয় এলাকাবাসীকেও। স্থানীয়রা বলছেন, প্রেমের এমন নির্মম পরিণতি সত্যিই বেদনাদায়ক। যে যুগল ভালোবেসে বেঁচে থাকার সংসার গড়েছিলেন পারিবারিক চাপে তা ভেঙে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করলো। এটি খুব নির্মম বাস্তবতা। দুটি তাজা প্রাণ এভাবে চলে যাওয়ায় শোকে বিহ্বল গ্রামবাসী।