বাংলাদেশ ফুটবলে কোচিং স্টাফে অস্থিরতা: পুরুষ দলে হাতাহাতি, নারী দলে শোকজ-ইস্তফা
স্পোর্টস ডেস্ক ||
বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ফুটবলে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এবার আলোচনায় উঠে এসেছে কোচিং স্টাফের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। পুরুষ অনূর্ধ্ব-২০ দলের প্রধান কোচ জেরার্ড জোন্স ও সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনায় তৈরি হয়েছে অস্বস্তি। এর মধ্যেই নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচিং স্টাফেও অসন্তোষ, মনোমালিন্য, কারণ দর্শানোর নোটিশ ও পদত্যাগের ঘটনা সামনে এসেছে। একই সময়ে দুটি বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের কোচিং কাঠামোয় এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) জন্য নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অনূর্ধ্ব-২০ দলে কোচদের বিরোধ
উজবেকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব সামনে রেখে প্রস্তুতিতে থাকা বাংলাদেশ দলের টিম হোটেলে জেরার্ড জোন্স ও আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে বিষয়টি ধাক্কাধাক্কি বা হাতাহাতিতে গড়ায়। পরে জোন্স জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন। পুলিশ হোটেলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
তবে ঘটনার বর্ণনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। জেরার্ড জোন্স নিজে হাতাহাতির খবরকে ভুল ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি হামলার শিকার হয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সতর্কতার বিষয়।
জোন্সকে সরানো নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা
ঘটনার পর জেরার্ড জোন্সকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে—এমন খবর একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কোথাও তাকে বরখাস্ত, আবার কোথাও ‘ওএসডি’ করার কথা বলা হয়েছে। তবে জোন্স নিজে বরখাস্তের খবর অস্বীকার করেন। ২৬ আগস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাফুফের ভেতরে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে তখনও অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে তার বর্তমান দায়িত্বের বিষয়ে বাফুফের আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত অবস্থানকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জেরার্ড জোন্স গত জুনে দুই বছরের চুক্তিতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর বেতন ও নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অভিযোগও আলোচনায় আসে। এর পরপরই সহকারী কোচের সঙ্গে বিরোধের ঘটনা সামনে আসায় দলটির প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলেও অসন্তোষ
পুরুষ দলের এই ঘটনার মধ্যেই নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচিং স্টাফে অসন্তোষের খবর সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলের কোচিং স্টাফের সদস্য মিরোনা আক্তারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাফুফে। একই সঙ্গে কোচিং স্টাফের আরেক সদস্য উম্মে হাফসা রুমকি পদত্যাগ করেছেন
নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় নারী দলের সাবেক কোচ ও বাফুফের হেড অব একাডেমি গোলাম রব্বানী ছোটন। তিনি অন্য একটি দায়িত্বে থাকাকালে প্রায় দুই সপ্তাহ দলটির দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটু। এ সময় কোচিং স্টাফের কয়েকজনের সঙ্গে টিটুর দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাঠেই প্রকাশ্যে আসে বিরোধ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুশীলনের সময় খেলোয়াড়দের সামনে কোচিং স্টাফের সদস্যদের ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়মিত মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটুর বিরুদ্ধে। এতে কোচিং স্টাফের কয়েকজনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
একপর্যায়ে মিরোনা আক্তারের সঙ্গে টিটুর বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। অনুশীলনের মাঠে খেলোয়াড়দের সামনেই মিরোনা বাঁশি ছুড়ে মাঠ ত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এরপর বাফুফে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। মিরোনা এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করে শোকজের জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। টিটুও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
বাফুফের নারী উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ মিরোনাকে শোকজ করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, শোকজের জবাব পাওয়ার পর পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে মিরোনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রুমকির পদত্যাগ ঘিরেও প্রশ্ন
নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচিং স্টাফের সদস্য উম্মে হাফসা রুমকির পদত্যাগের ঘটনাটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাফুফে সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আবেদন করে চাকরি ছেড়েছেন। তবে তার পদত্যাগের কারণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। যেসব অভিযোগের কথা সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে, সেগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়ায় সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক অভিযানের আগে অস্বস্তি
পুরুষ অনূর্ধ্ব-২০ দলের জন্য পরিস্থিতিটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দলটি এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে অংশ নিতে উজবেকিস্তান সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৩১ আগস্ট থেকে বাছাইপর্বের ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা। সফরের ঠিক আগে প্রধান ও সহকারী কোচের বিরোধ এবং প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা দলের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচিং স্টাফে শোকজ ও পদত্যাগের ঘটনা বয়সভিত্তিক জাতীয় দলগুলোর ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তবে এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং বাফুফের আনুষ্ঠানিক তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক ফুটবলে প্রতিভা বিকাশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক দল গঠনের জন্য কোচিং স্টাফের মধ্যে পেশাদার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি করে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি ও দলের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখাই এখন বাফুফের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।