চীনের J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বাংলাদেশ: আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে বড় পদক্ষেপ
মো: নাজমুল হাসান বাবু॥
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের পরিকল্পনায় বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। চীনের তৈরি J-10CE বহুমুখী যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী’র তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন।
সরকারের একটি কমিটি সম্ভাব্য ক্রয়চুক্তির খসড়া প্রস্তুতের কাজ করছে। তবে এখনো কতটি বিমান কেনা হবে, মোট ব্যয় কত হবে কিংবা কবে বিমানগুলো বাংলাদেশে আসবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে বিষয়টিকে চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি নয়, বরং আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কতটি J-10CE কেনার কথা ভাবছে বাংলাদেশ?
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ২৪টি J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার বিষয় বিবেচনা করছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি।
জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, বাজেট সহায়তা পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরেই ক্রয়প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারে; তা সম্ভব না হলে বিষয়টি পরবর্তী বাজেটে নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখনো বাজেট ও আলোচনার ওপর নির্ভরশীল।
কেন J-10CE-এর দিকে বাংলাদেশের নজর?
বাংলাদেশের বিমানবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বহরের আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার মুখোমুখি। সেই প্রেক্ষাপটে বহুমুখী যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন নতুন বিমান যুক্ত করার উদ্যোগকে আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
J-10CE হলো চীনের J-10C যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। বিমানটি আকাশ প্রতিরক্ষা, আকাশযুদ্ধ এবং নির্দিষ্ট ধরনের স্থল আক্রমণসহ একাধিক মিশনে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
J-10CE নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ আরও বেড়েছিল ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর। পাকিস্তান দাবি করেছিল, ওই সংঘাতে চীনা J-10CE ব্যবহার করে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছিল। তবে ওই দাবির সব বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি এবং বিষয়টি বিতর্কিত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী অঞ্চলের ওই সংঘাতে বিমানটির কথিত কার্যকারিতার বিষয়টিও তারা বিবেচনায় নিয়েছে।
চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত
বাংলাদেশের জন্য এই সম্ভাব্য ক্রয় শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঢাকা-বেইজিং প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ধারাবাহিকতা।
গত দুই দশকে চীন বাংলাদেশকে নৌযান, যুদ্ধবিমান, ট্যাংক ও ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। ফলে চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম, বরং Reuters-এর হিসাবে প্রধান সরবরাহকারী।
J-10CE কেনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-চীন প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। যুদ্ধবিমান কেনার সঙ্গে সাধারণত পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতার বিষয়ও জড়িয়ে থাকে।
তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশ এখনো J-10CE কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা চুক্তি ঘোষণা করেনি।
সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে খসড়া চুক্তি প্রস্তুত এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। বিমানের সংখ্যা, দাম এবং সরবরাহের সময়সূচি আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
তাই কিছু প্রতিবেদনে ২০ বা ২৪টি বিমান এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তির যে সংখ্যা বা অর্থমূল্য উঠে এসেছে, সেগুলোকে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় কী পরিবর্তন আসতে পারে?
ক্রয়টি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। আধুনিক বহুমুখী যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে শুধু যুদ্ধবিমান কিনলেই একটি দেশের বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হয়ে যায় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক রাডার, প্রশিক্ষিত পাইলট, অস্ত্রব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, ঘাঁটির অবকাঠামো এবং বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের মধ্যে সমন্বিত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
অতএব, J-10CE প্রকল্পের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে বাংলাদেশ বিমানগুলোকে কীভাবে সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
চীনা যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও নজর কাড়তে পারে। বাংলাদেশ একই সময়ে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করছে।
চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লে ভারতের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রও বিষয়টি কৌশলগত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটিকে জাতীয় প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক গভীর হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখে, তাহলে ঢাকার সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে কৌশলগত ভারসাম্য ধরে রাখা।
কেন এখন এই উদ্যোগ?
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরোনো যুদ্ধবিমান ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন এবং আধুনিক বহুমুখী যুদ্ধবিমান যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই নতুন ক্রয়ের আলোচনা সামনে এসেছে।
সরকারের বর্তমান বক্তব্যে এটিকে জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ও বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে J-10CE ক্রয়কে কেবল চীনমুখী কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হবে না; এর পেছনে সামরিক সক্ষমতা, বাজেট, প্রযুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার বিষয়ও রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়—
প্রথমত, চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বিমানটির সংখ্যা ও মূল্য কত নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয়ত, চলতি অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া যায় কি না।
তৃতীয়ত, চূড়ান্ত চুক্তিতে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্র, খুচরা যন্ত্রাংশ ও সরবরাহের সময়সূচি কী থাকে।
এর আগে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ২০ বা ২৪টি বিমান কিংবা নির্দিষ্ট কোনো অর্থমূল্যকে চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষণ: শুধু যুদ্ধবিমান নয়, বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত
সবদিক বিবেচনায়, চীনের J-10CE কেনার উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের একটি সম্ভাব্য বড় পদক্ষেপ। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের পরীক্ষা। কারণ প্রতিরক্ষা ক্রয় সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেনের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ও সামরিক নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
সুতরাং, এই মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভুল মূল্যায়ন হলো—বাংলাদেশ J-10CE কেনার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক ধাপ এগিয়েছে, কিন্তু চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি এখনো হয়নি।
চূড়ান্ত চুক্তি হলে সেটি শুধু বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা-কূটনীতির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এবং প্রকাশিত সরকারি বক্তব্য।