ডলি পার্টনের প্রয়াণে বিশ্বসংগীতে শোকের ছায়া
বিনোদন ডেস্ক ||
কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, গীতিকার ও অভিনেত্রী ডলি পার্টন আর নেই। ৮০ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ন্যাশভিলে মারা গেছেন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই শিল্পী। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সংগীত, চলচ্চিত্র, ব্যবসা ও মানবকল্যাণে অসাধারণ প্রভাব রেখে যাওয়া পার্টনের মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ডলি পার্টনের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, ১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া পার্টন ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট ন্যাশভিলে শান্তিপূর্ণভাবে মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
ছয় দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণিল ক্যারিয়ার
টেনেসির দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে ডলি পার্টন নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। শৈশব থেকেই গান লেখা ও সংগীতচর্চা শুরু করা পার্টন কৈশোরেই রেডিও ও মঞ্চে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে ন্যাশভিলে গিয়ে তাঁর সংগীতজীবন নতুন গতি পায়। পোর্টার ওয়াগনারের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ার পর একক শিল্পী হিসেবেও তিনি অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন।
‘Jolene’, ‘Coat of Many Colors’ এবং ‘I Will Always Love You’-এর মতো গান তাঁকে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে। বিশেষ করে ‘I Will Always Love You’ গানটি পরবর্তীতে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে নতুন করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রায় ছয় দশকের ক্যারিয়ারে পার্টন ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করেন এবং তাঁর রেকর্ডের বিক্রি ১০ কোটিরও বেশি বলে Reuters জানিয়েছে।
সংগীতের গণ্ডি ছাড়িয়ে চলচ্চিত্র ও ব্যবসায়
শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ডলি পার্টন। অভিনয় করেছেন একাধিক চলচ্চিত্রে এবং টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। একই সঙ্গে নিজের ব্র্যান্ড ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ গড়ে তোলেন।
টেনেসিতে প্রতিষ্ঠিত তাঁর জনপ্রিয় থিম পার্ক ‘Dollywood’ পরবর্তীতে রাজ্যটির অন্যতম পরিচিত পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়। সংগীতের রয়্যালটি, চলচ্চিত্র, পণ্য, পর্যটন ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগ মিলিয়ে তিনি একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যও গড়ে তুলেছিলেন।
তবে বিপুল সাফল্যের মধ্যেও নিজের শিকড় ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ।
মানবকল্যাণে রেখে গেলেন বড় উত্তরাধিকার
ডলি পার্টনের পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড। ১৯৯৫ সালে তিনি ‘Imagination Library’ চালু করেন, যার মাধ্যমে শিশুদের বিনামূল্যে বই দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি বই শিশুদের কাছে পৌঁছেছে।
শিক্ষা ও শিশুদের উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা ও স্বাস্থ্যখাতেও তিনি বড় অঙ্কের সহায়তা দিয়েছেন। করোনাভাইরাস মহামারির সময় ভ্যাকসিন গবেষণায় ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটিকে ১০ লাখ ডলার দান করেছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে হারিকেন হেলেনের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যও ১০ লাখ ডলার অনুদান দেন।
তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর পরও ‘Imagination Library’-এর মাধ্যমে তাঁর মানবকল্যাণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধা ও শোক
ডলি পার্টনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সংগীত ও বিনোদন জগতের বহু তারকা তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁর গডডটার ও সংগীতশিল্পী মাইলি সাইরাস, টেইলর সুইফটসহ বহু শিল্পী পার্টনের প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করেছেন।
তাঁর মৃত্যু শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পীর বিদায় নয়; বরং মার্কিন কান্ট্রি সংগীতের একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ডলি পার্টনের গান, অভিনয়, উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য এবং শিশুদের জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের মানবকল্যাণমূলক কাজ তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখবে। তাঁর নিজের ওয়েবসাইটে তাঁকে সংগীতশিল্পী, গীতিকার, অভিনেত্রী, লেখক ও মানবহিতৈষী হিসেবে স্মরণ করে বলা হয়েছে—তাঁর উত্তরাধিকার সংগীতের পাশাপাশি ভালোবাসা, দয়া ও মানুষের পাশে থাকার মধ্যেও বেঁচে থাকবে।