জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ২.৮ বিলিয়ন ডলারের চাপ, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি
জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ২.৮ বিলিয়ন ডলারের চাপ, ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি
ঢাকা ডেস্ক॥
বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় গত বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা Zero Carbon Analytics (ZCA)-এর নতুন বিশ্লেষণে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ZCA-এর হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তেল, গ্যাস ও কয়লার গড় দাম যদি বছরের বাকি সময়ও একই পর্যায়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বিল ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। অতিরিক্ত এই ব্যয় দেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
আমদানি কমলেও কমেনি ব্যয়ের চাপ
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশের LNG আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে LNG আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে ০.৬৩ মিলিয়ন টন থেকে ০.১১ মিলিয়ন টনে নেমে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির সরবরাহ সংকট এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে আমদানির পরিমাণ কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেশি থাকায় মোট ব্যয়ের চাপ কমেনি। বরং ZCA-এর হিসাবে, বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বছর শেষে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ২.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
টাকার মান ও মূল্যস্ফীতিতে চাপের আশঙ্কা
অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে টাকার ওপর চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ZCA-এর হিসাব অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমদানি কভার—অর্থাৎ বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে কত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব—প্রায় ৫.৭ মাস থেকে ৫.২ মাসে নেমে আসতে পারে। (zerocarbon-analytics.org)
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসনির্ভরতা বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও আমদানি করা জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ZCA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসনির্ভর ছিল। ফলে LNG সরবরাহে বিঘ্ন বা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে।
চলতি সংকটের মধ্যে সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে LNG সংগ্রহ, স্পট মার্কেট থেকে আমদানি এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি LNG আমদানির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর
ZCA-এর বিশ্লেষণে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, অতিরিক্ত ২.৮ বিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন করা সম্ভব হতে পারে, যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রায় ৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৫ শতাংশের সমান।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য সক্ষমতা যুক্ত করার প্রয়োজন হবে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানি নিরাপত্তা
বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি-নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে LNG সরবরাহে আন্তর্জাতিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ২.৮ বিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ব্যয় নয়—এটি বর্তমান বছরের গড় আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য ও নির্দিষ্ট আমদানি-সংক্রান্ত অনুমানের ভিত্তিতে ZCA-এর করা একটি পূর্বাভাস। বাজারদর বা আমদানির পরিমাণ পরিবর্তিত হলে প্রকৃত ব্যয়ও ভিন্ন হতে পারে।