মাথার খুলির ভেতর নতুন রোগপ্রতিরোধী কাঠামোর সন্ধান বিজ্ঞানীদের
নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা ডেস্ক||
মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণায় নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকরা ইঁদুরের মাথার খুলির অস্থিমজ্জার ভেতরে এমন বিশেষ লিম্ফয়েড কাঠামোর সন্ধান পেয়েছেন, যা মস্তিষ্কের রোগপ্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণাটি ১৯ আগস্ট ২০২৬ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই কাঠামোগুলো দেখতে অনেকটা লিম্ফ নোডের ‘জার্মিনাল সেন্টার’-এর মতো। এখানে রোগপ্রতিরোধী বি-সেল ও টি-সেলসহ বিভিন্ন ইমিউন কোষ সক্রিয় হয়ে মস্তিষ্ক থেকে আসা অ্যান্টিজেন শনাক্ত করতে এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখন পর্যন্ত এই বিশেষ কাঠামোর সরাসরি প্রমাণ ইঁদুরের খুলিতে পাওয়া গেছে। মানুষের খুলিতে একই ধরনের কাঠামো রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাই এটিকে মানুষের নতুন অঙ্গ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।
খুলির ভেতরে কী খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা?
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা খুলির অস্থিমজ্জার মধ্যে সংগঠিত লিম্ফয়েড কাঠামো শনাক্ত করেছেন। সেখানে অ্যান্টিজেন-উপস্থাপনকারী কোষ, বি-সেল ও টি-সেলের সমাবেশ দেখা যায়। বিশেষ করে ‘জার্মিনাল সেন্টার’-সদৃশ অঞ্চলগুলো বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে।
সাধারণত লিম্ফ নোডের মতো অঙ্গগুলোতে জার্মিনাল সেন্টার তৈরি হয়, যেখানে বি-সেল নির্দিষ্ট জীবাণু বা অন্য ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত করার পর আরও কার্যকর অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, খুলির অস্থিমজ্জাতেও এমন প্রতিরোধ-সংক্রান্ত কার্যক্রম ঘটতে পারে।
গবেষণার প্রথম লেখক জ্যাং হিউন পার্ক এবং জ্যেষ্ঠ গবেষক জোনাথন কিপনিসের নেতৃত্বে দলটি দেখিয়েছে, খুলির অস্থিমজ্জার এই কাঠামো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের বা CNS-এর রোগপ্রতিরোধ পর্যবেক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে।
মস্তিষ্কের সঙ্গে খুলির অস্থিমজ্জার সরাসরি যোগাযোগ
এই আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে কয়েক বছরের গবেষণা। বিজ্ঞানীরা এর আগে দেখতে পেয়েছিলেন, মস্তিষ্ক ও খুলির অস্থিমজ্জার মধ্যে ক্ষুদ্র হাড়ের চ্যানেল বা পথ রয়েছে। এসব পথের মাধ্যমে মস্তিষ্কের আবরণী এবং খুলির অস্থিমজ্জার মধ্যে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড ও রোগপ্রতিরোধী কোষের যোগাযোগ হতে পারে।
নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। গবেষকদের পরীক্ষায় দেখা যায়, মস্তিষ্ক থেকে আসা অ্যান্টিজেন খুলির অস্থিমজ্জার লিম্ফয়েড কাঠামোতে পৌঁছাতে পারে এবং সেখানে নির্দিষ্ট রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, মস্তিষ্ক এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন—দীর্ঘদিনের এই ধারণা আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
মস্তিষ্কের ক্যানসারের বিরুদ্ধে সম্ভাবনার ইঙ্গিত
গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো মস্তিষ্কের ক্যানসার নিয়ে পাওয়া ফলাফল। ইঁদুরের ব্রেন টিউমার মডেলে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, খুলির অস্থিমজ্জার এই লিম্ফয়েড কাঠামো টিউমারের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ায় অংশ নেয়।
এর ফলে ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন ধরনের ইমিউনোথেরাপি বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার কৌশল তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই গবেষণার ফল এখনো প্রাণী-পর্যায়ের পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ। মানুষের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি কার্যকর বা নিরাপদ হবে কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
আগের গবেষণাতেও খুলির অস্থিমজ্জার গুরুত্ব উঠে এসেছে
খুলির অস্থিমজ্জাকে ঘিরে এই গবেষণা সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। ২০২৪ সালে Nature-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের খুলির অস্থিমজ্জা একটি সক্রিয় ও স্থিতিস্থাপক রক্তকোষ-উৎপাদনকারী বা হেমাটোপোয়েটিক পরিবেশ হিসেবে কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের আরেক গবেষণায় শিশুদের মস্তিষ্কের টিউমার ও খুলির অস্থিমজ্জার মধ্যে রোগপ্রতিরোধ-সংক্রান্ত একটি যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা যায়, কিছু মস্তিষ্কের টিউমার খুলির অস্থিমজ্জার রক্তকোষ তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং এর মাধ্যমে টিউমারের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
মানুষের ক্ষেত্রেও কি একই ‘অঙ্গ’ রয়েছে?
এ মুহূর্তে এর উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া যাচ্ছে না।
নতুন গবেষণায় যে লিম্ফয়েড কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তার কার্যকর প্রমাণ ইঁদুরের মডেলে পাওয়া গেছে। গবেষকেরা মানুষের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তাই ‘মানুষের খুলির ভেতরে নতুন অঙ্গ আবিষ্কার’—এভাবে বিষয়টিকে সরাসরি চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেয়ে ‘নতুন অঙ্গসদৃশ রোগপ্রতিরোধী কাঠামোর সন্ধান’ বলা বেশি বৈজ্ঞানিকভাবে সতর্ক।
এই আবিষ্কার অবশ্য মানুষের মস্তিষ্ক, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং খুলির অস্থিমজ্জার পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে নতুন একটি দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ গবেষণায় যদি মানুষের ক্ষেত্রেও একই কাঠামোর উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়, তাহলে মস্তিষ্কের ক্যানসারসহ বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা ও রোগপ্রতিরোধ গবেষণায় এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।