নুসরাত হত্যা মামলায় ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, ৪ জনের যাবজ্জীবন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে চার আসামির সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার বাকি ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।
যে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল
হাইকোর্ট যে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, তারা হলেন—সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা এবং মাদ্রাসাছাত্র শাহাদাত হোসেন শামীম।
অন্যদিকে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি এবং জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন।
১০ আসামি খালাস
মামলার মোট ১৬ আসামির মধ্যে বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ফলে ২০১৯ সালে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এলো উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে।
কী ঘটেছিল নুসরাতের সঙ্গে?
মামলার নথি ও বিভিন্ন সময় প্রকাশিত আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতকে যৌন হয়রানি করেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাত ও তার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে।
এরপর ৬ এপ্রিল ২০১৯, আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল ২০১৯ নুসরাত মারা যান।
দ্রুত শেষ হয়েছিল বিচারিক আদালতের বিচার
নুসরাতের মৃত্যুর পর তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয়। মামলার বিচার শেষে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর সব ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
নিম্ন আদালতের ওই রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন। হাইকোর্টে মামলাটি ডেথ রেফারেন্স মামলা ১৪০/২০১৯ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর হাইকোর্টের রায়
নিম্ন আদালতের রায়ের প্রায় সাত বছর পর উচ্চ আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়। চলতি বছরের ২৮ জুলাই আপিলের শুনানি শুরু হয় এবং ২০ আগস্ট শুনানি শেষ করে রায়ের জন্য ২৪ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়।
সোমবার সকালে হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় পড়া শুরু করেন। রায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের সাজা যাবজ্জীবনে পরিবর্তন এবং ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়।
দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছিল নুসরাত হত্যাকাণ্ড
নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ২০১৯ সালে বাংলাদেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। একজন শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ থেকে শুরু করে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ, এরপর পরীক্ষাকেন্দ্রে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা নারী ও শিশু নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ শেষ হলো। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ রয়েছে।