নেপালে ভয়াবহ বন্যা: মৃতের সংখ্যা ৬৬৯, নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার; পুনর্গঠনে লাগতে পারে ৪–৫ বিলিয়ন ডলার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে অন্তত ৬৬৯ জন এবং চীনের তিব্বতে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই দেশের মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। একই সঙ্গে বিপর্যস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে নেপালের ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে।
২৯ আগস্ট প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার পর নেপালে আবারও উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়েছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু এবং ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথ উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে।
হিমবাহ ধস থেকে ভয়াবহ বন্যা
২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহ ধসের পর বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীগুলোর স্রোতে নেমে আসে। এতে সীমান্তবর্তী জনপদ, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নেপালের নুওয়াকোট ও আশপাশের অঞ্চল এবং তিব্বতের গিরং কাউন্টি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোও সম্ভব হচ্ছে না।
প্রায় ৩ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ
নেপালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে ৬২৬টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল এবং প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষকে তখনো নিখোঁজ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল। পরে বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার ও মরদেহ শনাক্তের কাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
রয়টার্সের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নেপালে প্রায় ২ হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন, যাদের অনেকেই পর্যটক বা তীর্থযাত্রী ছিলেন।
এ কারণে উদ্ধার অভিযান শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের স্বজনরাও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
পুনর্গঠনে ৪–৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন
বন্যায় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক প্রভাবও বড় হতে যাচ্ছে।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রাথমিক হিসাবে পুনর্গঠনে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এটি এখনো প্রাথমিক অনুমান এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন চলছে।
এই অর্থের পরিমাণ নেপালের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান হতে পারে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির অর্থনীতি পর্যটন, প্রবাসী আয় ও জলবিদ্যুতের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় অবকাঠামোর ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে নেপাল
নেপাল সরকার জানিয়েছে, সাধারণ উদ্ধারকাজের পাশাপাশি টানেলে আটকে পড়া মানুষ উদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের মতো জটিল কাজে বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।
ভারত ও চীন ইতোমধ্যে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর পাশাপাশি টানেল উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তায় বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।
উদ্ধারকাজে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
খারাপ আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং ধসে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা উদ্ধার অভিযানের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু এলাকায় রাস্তা ও সেতু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় হেলিকপ্টারসহ বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ ও পানিতে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে পরিচয় নিশ্চিত করতে DNA নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে পরিচয়হীন মরদেহ সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।
সংখ্যায় বিভ্রান্তি কেন?
ঘটনার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন সময়ে হতাহতের সংখ্যা ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। শনিবার বিকেলে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৬২৬টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছিল। পরে রয়টার্স ও এপি নতুন উদ্ধার ও হিসাবের ভিত্তিতে নেপালে মৃতের সংখ্যা ৬৬৯ এবং তিব্বতে ৭ জন বলে জানিয়েছে। ফলে আগের ৬৩৩ জনের হিসাবটি এখন সর্বশেষ সংখ্যা নয়।
ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব এবং নিখোঁজদের সন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।