যুক্তরাজ্যের সহায়তা কমায় দুই বছর আগেই বন্ধ হচ্ছে সুন্দরবনের জলবায়ু প্রকল্প
নিজস্ব প্রতিনিধি ||
যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কমিয়ে দেওয়ার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সুন্দরবনকেন্দ্রিক একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু প্রকল্পে। অর্থায়ন সংকটের কারণে প্রকল্পটি মূল নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে সুন্দরবনসংলগ্ন জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা হাজারো মানুষের জন্য পরিকল্পিত সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সাল থেকে সুন্দরবন এলাকায় প্রকল্পটির একটি অংশ বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, স্থানীয় মানুষের জীবিকা শক্তিশালী করা এবং দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন অভিযোজনমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা।
দুই বছর আগেই শেষ হচ্ছে প্রকল্প
প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা বাজেটে কাটছাঁটের পর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনকে জানানো হয় যে তাদের কার্যক্রম জুনেই শেষ করতে হবে।
পরবর্তীতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে আলোচনার পর সময়সীমা কিছুটা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়। ফলে মূল পরিকল্পনার তুলনায় প্রকল্পটি প্রায় দুই বছর আগেই শেষ হতে যাচ্ছে।
কী ধরনের কাজ হওয়ার কথা ছিল
প্রকল্পটির আওতায় সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় জলবায়ু সহনশীল কৃষি, মাছ চাষ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কতাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা হচ্ছিল।
বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষিপদ্ধতি, মাছ চাষে উন্নত প্রযুক্তি ও উপকরণ এবং অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের আগাম তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির কার্যক্রম খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। সংস্থাটির প্রকল্প নথিতে প্রায় ৬৩ হাজার ৮৭৬টি পরিবারের সঙ্গে কাজ করার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রায়ও প্রভাব
যুক্তরাজ্যের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় প্রকল্পের নির্ধারিত অর্থের পুরোটা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে চলতি বছরের মধ্যে যে সংখ্যক মানুষকে প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবে তার চেয়ে কম মানুষ সুবিধা পাবেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের বাংলাদেশ কার্যালয়ের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক নেতৃত্বে থাকা তামান্না রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির জন্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ দশমিক ২ মিলিয়ন পাউন্ড পাওয়ার কথা থাকলেও সংস্থাটি তার চেয়ে অনেক কম অর্থ পেয়েছে। ফলে প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রাও কমিয়ে আনতে হয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে সুন্দরবন অঞ্চল
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব থেকে সুরক্ষা দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ভূমিক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সুন্দরবন ও এর আশপাশের জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও সুন্দরবনের উপকূলীয় পরিবর্তন ও জলবায়ুজনিত চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ অবস্থায় জলবায়ু অভিযোজন, স্থানীয় মানুষের বিকল্প জীবিকা এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার মতো কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন ও পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন।
সুন্দরবন রক্ষায় নতুন উদ্যোগও চলছে
একই সময়ে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নতুন কিছু উদ্যোগও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন—IUCN এবং ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা AFD-এর অংশীদারত্বে ২০২৬ সালে Conservation and Restoration Initiatives in the Sundarbans Region (CRIS) প্রকল্প চালু হয়েছে।
এই পাঁচ বছর মেয়াদি উদ্যোগের লক্ষ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানো।
ফলে একদিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু প্রকল্প অর্থায়ন সংকটে নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হওয়ার পথে, অন্যদিকে সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নতুন প্রকল্পও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।