পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল এলকা কেটে বেপরোয়া রিসোর্ট তৈরি ; কারা করছে এসব রিসোর্ট জানেনা সরকার, নেই কোন নিয়মনীতি ও তদারকি
মাহিদুল ইসলাম,
মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজার পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল এলাকা কেটে নামে বেনামে বেপরোয়া ভাবে ইকো-রিসোর্ট ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এসব রিসোর্ট কারা করছে এর কোন তালিকা বা বৈধতা আছে কি না তা সুনির্দিষ্ট ভাবে জানেন না সরকারের কোন বিভাগই। গত কয়েকবছরে জেলায় অন্তত প্রায় দেড়শো রিসোর্ট গড়ে তুলা হয়েছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানের বহিরাগতরা জায়গা কিনে এসব রিসোর্ট তৈরি করছেন। বিশেষ করে জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় শতাধিক রিসোর্ট বানানো হয়েছে। এরমধ্যে কেউ একটি বাসায় কয়েকটি কক্ষ বানিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়েছেন। এসব রিসোর্ট নিয়ে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। কারা এতো এতো রিসোর্ট করছে জানেন না কেউ। পাহাড়-টিলা বা বনাঞ্চলের পরিবেশ নষ্ট করে কেন এতো রিসোর্ট করা হচ্ছে এ নিয়ে পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন জেলা মৌলভীবাজার। এ জেলার সাতটি উপজেলায় কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক ছোট-বড় মিলে প্রায় শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। বাস্তবে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে পর্যটন শিল্পের কোন উন্নতি না ঘটলেও পর্যটনের নাম করে রিসোর্ট ব্যবসার ব্যাপক উন্নতি ঘটছে। জেলায় নামে বেনামে অন্তত ২০০ টি রিসোর্ট থাকলেও মূলধারার মাত্র ১০ থেকে ১২ টি রিসোর্ট রয়েছে। বেশিরভাগ রিসোর্ট করতে সরকারি কোন অনুমতি বা নিয়মনিতির তোয়াক্কা করা হয়নি। দিনের বেলা অথবা রাতের বেলাও নামদ্বারি এসব রিসোর্টে প্রবেশ নিষেধ।
জানা যায়, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পর্যটন জেলা হিসেবে মৌলভীবাজারকে ঘোষণা করা হয়। এরপর জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ২০১৩ সালে প্রায় ১৩ একর জায়গা জুড়ে প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এরপর কয়েকবছর পর্যায়ক্রমে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে কিছু রিসোর্ট ব্যবসার বিস্তার ঘটতে থাকে। তবে গত ৩ থেকে ৪ বছর ধরে বেপরোয়া ভাবে নামে বেনামে কোন ধরনের আইনের তোয়াক্কা ছাড়াই বাসাবাড়ি, পাহাড়-টিলা কেটে কিছু কক্ষ বানিয়ে রিসোর্ট নাম দেওয়া শুরু হয়। এসব নামে বেনামে রিসোর্টের সরকারি ভাবে নেই কোন বৈধতা। পর্যটন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কয়েকটি সংস্থা থাকলেও তারা জানেন না কারা এসব রিসোর্ট কিভাবে করেছে বা পরিচালনা করছে। নামদ্বারি এসব অধিকাংশ রিসোর্টের মালিক বহিরাগতরা।জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১০৩ টি রিসোর্ট শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। এরমধ্যে শুধুমাত্র রাধানগর এলাকায় অন্তত ৪০ থেকে ৪৫টি রিসোর্ট রয়েছে। পর্যটন জেলা ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও যতটুকু পর্যটন সমৃদ্ধ জেলা হওয়ার কথা, বাস্তবে সরকারিভাবে তার তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু মাত্র নামে বেনামে রিসোর্ট ব্যবসাটাই চাঙ্গা হয়েছে।
মূলধারার স্থানীয় রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক সময় শ্রীমঙ্গলের স্থানীয়রা কয়েক শতক জায়গা বিক্রি করেছেন বাহিরের কোন ব্যাক্তির কাছে। তিনি এসে একটা ঘর বা কয়েকটি কক্ষ বানিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়েছেন। অথচ ঐ ব্যাক্তি স্থানীয় এলাকাবাসী বা পর্যটন সংশ্লিষ্ট কারো সাথে পরামর্শ না করেই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা কোন সমস্যা হলে স্থানীয়দের সাথে কথা বলেন। অনেক প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরা, নৈশপ্রহরীও নেই। তারা নিজেরাই রিসোর্টের মালিক, ম্যানেজার হয়ে তা পরিচালনা করছেন। এতে করে এসব নামদ্বারি রিসোর্টের ভেতরে কি ঘটছে তা কেউ জানেনা। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গের একটা রিসোর্টে একটা ঘটনার পর রাতারাতি রিসোর্টের নাম পরিবর্তন করার ঘটনাও ঘটছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কোন তদারকি করা হয় না। ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর অথবা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ রিসোর্ট মালিক তা করেন না।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১০৩ টি রিসোর্ট আছে। পাহাড়ি এলকা বা কোথাও রিসোর্ট করতে হলো জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। প্রকৃতি পক্ষে পরিপূর্ণ রিসোর্টের সংখ্যা যদি বলি তাহলে শ্রীমঙ্গলে ১০ থেকে ১২ টি হবে। কেউ যদি ২ শতক জায়গা কিনে কয়েকটি কক্ষ বানায় তাহলে এটাতো রিসোর্টের মধ্যে পরেনা। রিসোর্ট শব্দ টাই অনেকেই বুঝেনা। একটা রিসোর্ট বানাতে হলে প্রচুর জায়গার প্রয়োজন হয় এরপর নিরাপত্তাসহ অনেক নিয়ম মেনে চলতে হয়। আমরা ব্যবসা করছি অথচ পৌরসভাকে প্রতি বছরে লাখ টাকার উপরে টেক্স দিচ্ছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টের পরিচালক বলেন, মৌলভীবাজারের পর্যটনের উন্নতির কথা চিন্তা করেই গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টের এর যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ক্যাটাগরির রিসোর্ট তৈরি হতে থাকে। আমরা সরকারের সকল আইন মেনে আমাদের রিসোর্ট পরিচালনা করছি। অথচ এখন দেখাযায় বেপরোয়া ভাবে রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব রিসোর্ট কিভাবে হচ্ছে কার অনুমতি নিয়ে হচ্ছে তা তদারকি করা খুবই প্রয়োজন।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ বলেন, আমাদের জেলায় প্রায় ২০০টি রিসোর্ট রয়েছে। এসব রিসোর্টের মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০০ টির উপর আছে। কিভাবে এতো রিসোর্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। অথচ প্রকৃত অর্থে শ্রীমঙ্গলে মাত্র ১০ থেকে ১২ টা রিসোর্ট আছে। যাদেরকে রিসোর্ট বলা যায়। অনেকেই ৩-৪ টা কক্ষ নিয়ে ভাড়া নিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন। এসব রিসোর্ট কারা করছে তা আমাদের জানা নেই।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৬০টি রিসোর্ট আছে। একটি রিসোর্ট করতে বিন্দু মাত্র অনুমতি যদি কারো নিতে হতো তাহলে এর সংখ্যা কমে আসতো।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময় পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল এলাকা কেটে রিসোর্ট বানানো হচ্ছে। কিভাবে পরিবেশর ক্ষতি করে রিসোর্ট বানানো হয় তা আমরা জানতে চাই। প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে টিলার উপর কেনো রিসোর্ট বানানো হয়। যারা রিসোর্ট বানাচ্ছে তারা বৈধ না অবৈধভাবে তা করছে আজ পর্যন্ত সরকারের কেউ তদারকি করতে দেখিনি। যত সময় যাচ্ছে বেপরোয়া ভাবে রিসোর্ট বানানোর সংখ্যা বাড়ছে। সরকারের উচিত এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করা। একটা রিসোর্ট তৈরির জন্য সরকারের অনেক গুলো দপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তা পরোয়া করছেন না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, কে রিসোর্ট করছে কে অনুমতি দিচ্ছে এসব আমার জানা নেই। রিসোর্টের বিষয় নিয়ে আমাদের আরও চিন্তা করা উচিত। আমরা ইতিমধ্যে একটা তালিকা করেছি। রিসোর্ট তৈরির জন্য একটা নীতিমালা করা দরকার। সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন করা আমি প্রয়োজন মনো করি।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ মাঈদুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছ থেকে প্রায় ৬০ টি রিসোর্ট হবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েছে। যেসব রিসোর্ট ২০ কক্ষ বা তার অধিক এসব রিসোর্টের ছাড়পত্র আমরা দেই। বাকি রিসোর্ট গুলো কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে এসব আমাদের জানা নেই।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল ও রিসোর্ট গুলো আমরা দেখা শোনা করি। যারা রিসোর্ট করছে হয়তো তারা কোন না কোন বিভাগ থেকে অনুমতি নিচ্ছে। আবার নাও নিতে পারে এসব বিষয় জানা নেই।