যে দেশে সুযোগে সবাই চোর, সে দেশে কী করে উদিত হবে সোনালী ভোর?
মোহাম্মদ উল্যা
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি॥
যে দেশে সুযোগে সবাই চোর, সে দেশে কী করে উদিত হবে সোনালী ভোর?” প্রশ্নটি নিছক একটি কাব্যিক উচ্চারণ নয়; এটি একটি জাতির বিবেকের সামনে দাঁড় করানো কঠিন বাস্তবতার প্রশ্ন। কোনো সমাজের অগ্রগতি শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক, সেতু, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে নির্ধারিত হয় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানুষের নৈতিকতা, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, আইনের শাসন, দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহির ওপর। মানুষের বিবেক যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, অন্যায় যখন স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয় এবং সুযোগ পেলেই নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকার হরণকে বুদ্ধিমত্তা মনে করা হয়, তখন উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে একটি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকে এগিয়ে যায়।
চুরি মানেই তালা ভেঙে কারও ঘরে ঢুকে সম্পদ নিয়ে যাওয়া নয়। ঘুষ গ্রহণ, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, প্রকল্পের অর্থে অনিয়ম, ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি, কর ফাঁকি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দায়িত্বে অবহেলা, অন্যের প্রাপ্য কেড়ে নেওয়া কিংবা প্রভাব খাটিয়ে অন্যায় সুবিধা নেওয়াও একই নৈতিক সংকটের বিভিন্ন রূপ। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, যখন এসব কাজকে সমাজের একটি অংশ অপরাধ হিসেবে দেখার পরিবর্তে ‘চালাকি’, ‘ম্যানেজ’, ‘সুযোগ’ কিংবা ‘সিস্টেমের অংশ’ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে, তখন অপরাধ শুধু ব্যক্তির মধ্যে থাকে না; তা সমাজের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
আমরা দুর্নীতিমুক্ত দেশ চাই, অথচ নিজের কাজ দ্রুত করাতে ঘুষ দিতে আপত্তি করি না। আমরা পরিচ্ছন্ন শহর চাই, অথচ যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলি। আমরা সুশাসন চাই, অথচ নিজের সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙাকে অপরাধ মনে করি না। আমরা অন্যের কর ফাঁকিকে রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ হিসেবে দেখি, অথচ নিজের দায় এড়ানোর সুযোগ খুঁজি। বাজারে ভেজাল ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, কিন্তু নিজের লাভের জন্য ক্রেতার সঙ্গে অসততা করতে দ্বিধা করি না। এই দ্বিচারিতাই আমাদের সংকটের অন্যতম গভীর কারণ। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যতটা কথা বলি, অন্যায় থেকে নিজেদের দূরে রাখার ক্ষেত্রে ততটা দৃঢ় নই।
একটি রাষ্ট্রে যখন সৎ মানুষ বারবার প্রশ্ন করেন, “সৎ থেকে লাভ কী?”, তখন বুঝতে হবে সংকট শুধু অর্থনীতিতে নয়, মানুষের বিবেকেও। যোগ্যতার বদলে তদবির, নিয়মের বদলে ঘুষ, ন্যায়ের বদলে প্রভাব এবং সততার বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থ যদি কার্যকর হওয়ার সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তাহলে তরুণ প্রজন্মের কাছেও নৈতিকতার মূল্য কমতে বাধ্য। তারা যদি দেখে অন্যায় করেও কেউ সম্মান, সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জন করছে, আর সৎ মানুষকে নানা বাধা অতিক্রম করতে হচ্ছে, তাহলে একসময় সততা তাদের কাছে আদর্শ নয়, বরং দুর্বলতা বলে মনে হতে পারে। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর পরিণতি আর কী হতে পারে?
দুর্নীতির ক্ষতি শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; দুর্নীতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করে। একটি সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হলে শুধু প্রকল্পের টাকা নষ্ট হয় না, মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। একটি হাসপাতালে অনিয়ম হলে শুধু অর্থের অপচয় হয় না, রোগীর জীবন বিপন্ন হয়। নিয়োগে অনিয়ম হলে শুধু একজন যোগ্য ব্যক্তি বঞ্চিত হন না, একটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা দুর্বল হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, প্রশাসন, বিচার ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে অনিয়মের প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। অর্থাৎ দুর্নীতি কোনো বিমূর্ত শব্দ নয়; এর মূল্য শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দুর্নীতিবাজ তৈরি হয় কীভাবে? কেবল ব্যক্তির লোভকে দায়ী করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? নিশ্চয়ই নয়। যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অস্বচ্ছ, যেখানে জবাবদিহি দুর্বল, যেখানে অপরাধের বিচার বিলম্বিত, যেখানে ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা সুবিধার ধারণা তৈরি হয় এবং যেখানে সৎ থাকার চেয়ে প্রভাব খাটানো বেশি কার্যকর—সেখানে দুর্নীতির পরিবেশ তৈরি হয়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে ধরে শাস্তি দেওয়া নয়; দুর্নীতিকে লাভজনক করে তোলে এমন ব্যবস্থাগত দুর্বলতাগুলোও দূর করা।
আইনের শাসন এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অপরাধী কে, তার পরিচয় কী, তার অর্থ বা ক্ষমতা কত—এসব বিচার্য হতে পারে না। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। সাধারণ নাগরিকের জন্য এক আইন আর প্রভাবশালীর জন্য অন্য আইন—এমন ধারণা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। আইনের ভয় যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইনের ওপর আস্থাও প্রয়োজন। মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে যে অন্যায় করলে বিচার হবে এবং নিরপরাধ হলে সুরক্ষা পাওয়া যাবে।
তবে সমাজের সবাই অসৎ—এমন ধারণাও সত্য নয়। এখনো অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন নীরবে সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। তাঁদের কারণেই সমাজ পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যায়নি। তাই “সবাই চোর” বলে হতাশ হয়ে বসে থাকা নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন অসৎ হওয়ার সুযোগ এত বেশি এবং সৎ থাকার মূল্য এত কম?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যবসা, রাজনীতি, আইন ও সামাজিক সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন প্রয়োজন। শিশুকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার শিক্ষা দিলে হবে না; তাকে সত্য বলা, অন্যের অধিকার সম্মান করা, দায়িত্ব পালন করা এবং অন্যায় সুবিধা প্রত্যাখ্যান করার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার হতে হবে নৈতিকতার প্রথম বিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে হবে চরিত্র গঠনের ক্ষেত্র। রাষ্ট্রকে হতে হবে ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতাকে হতে হবে সাহসী, তথ্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা যেমন সাংবাদিকতা নয়, তেমনি ক্ষমতাবানদের ভয় বা তোষামোদ করে সত্য গোপন করাও সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হতে পারে না। জনস্বার্থে সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন তোলাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রাষ্ট্রের কাছে নয়, নিজের কাছে। আমি কি ঘুষ দিই? আমি কি অন্যায় সুবিধা নিই? আমি কি নিয়ম ভেঙে নিজের স্বার্থ হাসিল করি? আমি কি সরকারি সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করি? আমি কি অন্যের অধিকার কেড়ে নিই? আমি কি অন্যায় দেখেও শুধু নিজের সুবিধার জন্য নীরব থাকি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এড়িয়ে গিয়ে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।
একটি দেশের পরিবর্তন কেবল আইন করে হয় না; পরিবর্তন আসে মানুষের আচরণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ঘুষকে ‘ম্যানেজ’ বলা বন্ধ করতে হবে, অন্যায় সুবিধাকে ‘স্মার্টনেস’ বলা বন্ধ করতে হবে, ক্ষমতার অপব্যবহারকে ‘প্রভাব’ বলে বৈধতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং সততাকে ‘বোকামি’ ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমরা উন্নত দেশ চাই। চাই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, আধুনিক হাসপাতাল, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপদ নগর ও সুন্দর ভবিষ্যৎ। কিন্তু নৈতিকতা ছাড়া এসব উন্নয়ন কতটা টেকসই হবে? একটি রাষ্ট্রের ভবন যতই উঁচু হোক, মানুষের বিবেক যদি নিচে নেমে যায়, তাহলে সেই উন্নয়ন একসময় নিজের ভারেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই আজ প্রশ্ন শুধু—দেশ কতটা উন্নত হয়েছে? প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা মানুষ হিসেবে কতটা উন্নত হয়েছি? আমাদের প্রতিষ্ঠান কতটা স্বচ্ছ? আমাদের আইন কতটা নিরপেক্ষ? আমাদের বিবেক কতটা জাগ্রত?
সোনালী ভোর আকাশ থেকে নেমে আসে না; মানুষের সততা, ন্যায়বোধ, দায়িত্ববোধ ও সম্মিলিত সাহসের হাত ধরেই তার আগমন ঘটে।
তাই অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজের দিকে তাকানোর সময় এসেছে। রাষ্ট্রকে বদলানোর দাবি তোলার পাশাপাশি নিজেদেরও বদলাতে হবে। কারণ যে সমাজে সুযোগ পেয়েও মানুষ অন্যায় করে না, ক্ষমতা পেয়েও ক্ষমতার অপব্যবহার করে না, দায়িত্ব পেয়েও জনগণের অধিকার বিক্রি করে না এবং অন্যায় দেখেও নীরব থাকে না—সোনালী ভোর আসলে সেই সমাজেই উদিত হয়।
অন্ধকারের জন্য শুধু সূর্যকে দোষ দিয়ে লাভ নেই; আলো জ্বালানোর দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে।
আজ সেই দায়িত্ব নেওয়ার সময়।
শুরুটা হোক আমার কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে, আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে।