তাপপ্রবাহ ও দাবানলে বিশ্বজুড়ে বায়ুর মান নিয়ে নতুন সতর্কতা
নিজস্ব প্রতিনিধি ||
তীব্র তাপপ্রবাহ ও দাবানলের বাড়তে থাকা প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুর মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)। সংস্থাটির নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায় বায়ুদূষণও আরও জটিল হয়ে উঠছে। এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর বাড়ছে চাপ।
WMO-এর ‘Air Quality and Climate Bulletin No. 6’ প্রকাশ করা হয়েছে ৭ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক নীল আকাশের জন্য নির্মল বায়ু দিবস উপলক্ষে। প্রতিবেদনে জলবায়ু ও বায়ুর মানের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানল ও তাপপ্রবাহের কারণে দূষণের পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে।
দাবানলের ধোঁয়ায় বাড়ছে ক্ষতিকর কণা
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে সূক্ষ্ম কণা বা PM2.5-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটারের চেয়েও ছোট এসব কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে পৌঁছাতে পারে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
WMO বলছে, দাবানল থেকে নির্গত PM2.5-এর মাত্রা ও বিষাক্ততার কারণে এর স্বাস্থ্যঝুঁকি সাধারণ বায়ুদূষণের তুলনায় আরও গুরুতর হতে পারে। শিল্পকারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত PM2.5 কমানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে অগ্রগতি হলেও দাবানল-সৃষ্ট দূষণের সংস্পর্শ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বিশ্বজুড়ে চরম দাবানলের ধোঁয়াজনিত ঘটনা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এসব ঘটনার সঙ্গে বছরে প্রায় এক লাখ অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হিসাবও প্রকৃত প্রভাবকে কম করে দেখাতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
তাপপ্রবাহে বাড়ে ভূমিস্তরের ওজোন
শুধু দাবানলের ধোঁয়া নয়, তীব্র গরমও বায়ুর মান খারাপ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। WMO জানিয়েছে, বেশি তাপমাত্রা, স্থির বায়ুপ্রবাহ এবং তীব্র সূর্যালোক ভূমিস্তরে ওজোন তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
ভূমিস্তরের ওজোন মানুষের শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘ সময় এর সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসযন্ত্রের রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে। তাপপ্রবাহের সময় দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীনের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিস্তরের ওজোন দূষণ বৃদ্ধির প্রমাণও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ধরনের দূষণ শুধু মানুষের স্বাস্থ্যেই প্রভাব ফেলে না। কৃষি ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ওজোন দূষণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে WMO জানিয়েছে।
২০২৫ সালেও কয়েকটি অঞ্চলে PM2.5-এর মাত্রা বেশি
WMO-এর প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের বায়ুর মানের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উত্তর কানাডা, রাশিয়ার কিছু অংশ এবং পশ্চিম-মধ্য আফ্রিকায় আগুনের কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় PM2.5-এর ঘনত্ব দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় বেশি ছিল।
উত্তর-পশ্চিম স্পেনেও ২০২৫ সালের গ্রীষ্মের শেষ দিকে ভয়াবহ দাবানলের কারণে PM2.5-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
অন্যদিকে, চীনে মানবসৃষ্ট দূষণ কমে আসায় PM2.5-এর মাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের নিচে ছিল। ভারতে অবশ্য জৈব পদার্থ পোড়ানো ও অন্যান্য দূষণের কারণে মাত্রা গড়ের ওপরে ছিল।
জলবায়ু ও বায়ুদূষণকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই
WMO-এর প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণকে আলাদা সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও চরম দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার দাবানল থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও কণা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করে এবং বায়ুর মানের উন্নতির প্রচেষ্টাকে পিছিয়ে দেয়।
WMO বলছে, ভবিষ্যতে চরম দাবানল-সৃষ্ট আবহাওয়া আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বায়ুর মানের নির্দেশিকা পূরণ করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আরও উন্নত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন
প্রতিবেদনে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে PM2.5, ভূমিস্তরের ওজোন, ব্ল্যাক কার্বন ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো দূষক সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে বলে WMO জানিয়েছে।
সংস্থাটির মতে, জলবায়ু ও বায়ুর মান—দুই ক্ষেত্রেই সমন্বিত নীতি, উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ বায়ুদূষণ কমানোর পদক্ষেপ একই সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।