সার ও জ্বালানি সংকটে বাড়ছে চাপ, ২০২৭ থেকে স্বস্তির আশা সরকারের
নিজস্ব প্রতিনিধি ||
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারের সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ ও বিক্ষোভ নতুন করে তীব্র হয়েছে। রাজশাহীতে সার সংকট ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে কৃষকেরা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। কুড়িগ্রামে দীর্ঘ অপেক্ষার পর সার না পেয়ে একটি ডিলারের গুদামে ভাঙচুর করে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। লালমনিরহাটেও সার সরবরাহের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকেরা।
অন্যদিকে, দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সাল থেকে পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি আনা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা।
রাজশাহীতে সার নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ
সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সরকারি নির্ধারিত দামে সার পাওয়ার দাবিতে রাজশাহীর পুঠিয়ায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা। সোমবার সকাল ১০টার দিকে বানেশ্বর বাজার এলাকায় কয়েক শত কৃষক সড়কে অবস্থান নেন।
কৃষকদের অভিযোগ, অনুমোদিত ডিলারদের দোকানে সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ খুচরা বাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে তারা সমস্যায় পড়ছেন।
প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধের পর পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমান কৃষকদের দ্রুত সার সরবরাহ এবং সরকারি নির্ধারিত দামে বিক্রির আশ্বাস দেন। এরপর কৃষকেরা অবরোধ তুলে নিলে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
তবে স্থানীয় সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি ও ডিলার ওসমান আলী সার সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর কাছে ১ হাজার ৪০ বস্তা বা প্রায় ৫১ টন ইউরিয়া মজুত রয়েছে।
কুড়িগ্রামে গুদাম থেকে সার নেওয়ার অভিযোগ
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সার কেনার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সরবরাহ না পাওয়ায় একপর্যায়ে কৃষকেরা একটি ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ডিলার মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে প্রায় ৭৫০ বস্তা সার ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। সকাল থেকে বিপুলসংখ্যক কৃষক সার কেনার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ডিলার ও সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনের সহায়তা চাইতে সরে যান। পরে কৃষকেরা গুদামে ঢুকে সার নিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপজেলায় সার সংকট নেই এবং কৃষকেরা ধৈর্য ধরে সংগ্রহ করলে প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার কথা। স্থানীয় প্রশাসনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে।
লালমনিরহাটেও কৃষকদের বিক্ষোভ
সার সরবরাহের দাবিতে লালমনিরহাটে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কও অবরোধ করেন কৃষকেরা। মহেন্দ্রনগর এলাকায় একটি সার গুদামের সামনে গাছের গুঁড়ি ফেলে তারা সড়কে অবস্থান নেন।
কৃষকদের অভিযোগ, আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না এবং কোথাও কোথাও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির চেষ্টা চলছে।
প্রশাসনের আশ্বাসের পর কৃষকেরা অবরোধ তুলে নেন। তবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জেলায় সার সংকট নেই। নির্দিষ্ট কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মজুত থাকার পরও কেন সংকটের অভিযোগ?
সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের অভিযোগের সঙ্গে সরকারি মজুতের তথ্যের মধ্যে একটি পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, প্রয়োজনের সময় অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বলছেন।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কৃষক, ডিলার ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার অনিয়ম, বণ্টন-সংক্রান্ত সমস্যা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কালোবাজারি বা অবৈধ মজুতের অভিযোগকে সংকটের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো এখনো প্রমাণিত নয়।
জ্বালানি সংকট কাটাতে ২০২৭ থেকে স্বস্তির আশা
সারের পাশাপাশি দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার জাতীয় সংসদে আলোচনায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালে কিছুটা স্বস্তি, ২০২৮ সালে আরও বেশি স্বস্তি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি সংকটমুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করা।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন কূপ খননের কাজ চলছে এবং অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানের জন্যও কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৩০টির কাজ ইতোমধ্যে চলছে। এসব কূপ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাড়তি ব্যয়ের চাপ এলএনজি আমদানিতে
জ্বালানি সংকটের মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকার একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষিতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শিল্প ও জনজীবনে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।