তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পের আগ্রহ: বাংলাদেশের সামনে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ
মন্তব্য প্রতিবেদন,
মোঃ নাজমুল হাসান বাবু ॥
যুক্তরাষ্ট্র–চীন–মক্কা চুক্তির টানাপোড়েনে বাংলাদেশের স্বার্থই হোক ঢাকার প্রধান বিবেচনা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শিগগির সরাসরি বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ৩১ আগস্ট পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, তিনি ভবিষ্যতে খুব শিগগিরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছেন। একই চিঠিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান।
ট্রাম্পের এই আগ্রহ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বাংলাদেশ নতুন করে বৈশ্বিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক; অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা—সব মিলিয়ে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন মক্কা চুক্তি ঘিরে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি।
আর এখানেই তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন—ঢাকা কোন পথে যাবে?
ট্রাম্প কেন তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে আগ্রহী?
প্রথমত, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। ট্রাম্পের চিঠিতেই বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি, বাণিজ্য ও মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ এই সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান অংশ।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৃহত্তর ভূরাজনীতিতেও রয়েছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক শক্তির সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটনের কাছে ঢাকার অবস্থান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখান থেকে সরাসরি বলা যাবে না যে চীনকে দূরে সরিয়ে আনতেই ট্রাম্প তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে চাইছেন। এমন কোনো বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়নি। এটি বরং বর্তমান বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে উঠে আসা একটি সম্ভাব্য বিশ্লেষণ।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও এখন নতুন মাত্রায়
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে। গত জুনে তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ওই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকও হয়। দুই দেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, শিক্ষা, কৃষি, মানবসম্পদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক দলীয় পর্যায়ের সহযোগিতাও ছিল।
অর্থাৎ বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে এবং চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করছে।
এটাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক শক্তি।
মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, নাকি নতুন ঝুঁকি?
মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
চুক্তিটি যদি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রযুক্তি, শ্রমবাজার, বিনিয়োগ এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি আরব ও তুরস্ক বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী রয়েছেন। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রবাসী শ্রমবাজারের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকিটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ বা জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
তাই শুধু কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে কিংবা কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয়ে যেতে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হওয়া উচিত—বাংলাদেশের স্বার্থ
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়; বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের স্বার্থ আদায় করা।
যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বাজার সুবিধা দেয়—বাংলাদেশ অবশ্যই সেই সুযোগ গ্রহণ করবে।
চীন যদি অবকাঠামো, শিল্প, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতায় বাংলাদেশের পাশে থাকে—সেই সম্পর্কও বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো নতুন প্রতিরক্ষা বা কৌশলগত সহযোগিতা যদি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বাস্তব সুবিধা তৈরি করে, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যেন অন্য কোনো দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে না যায়—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নিউইয়র্কে ট্রাম্প–তারেক বৈঠক হলে কী বার্তা যাবে?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের জাতীয় বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক হলে সেটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত হবে।
এ ধরনের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যেতে পারে—বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে আগ্রহী, কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে বিদ্যমান বৈধ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতাও অব্যাহত রাখবে।
অর্থাৎ বার্তাটি হতে পারে:
বাংলাদেশ কারও শত্রু নয়, আবার কারও অনুসারীও নয়। বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থে বন্ধু বেছে নেবে, অংশীদারিত্ব করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেবে।
শেষ কথা
ট্রাম্পের তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহকে তাই শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনীতির নানা মাত্রা থাকতে পারে।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বৈঠক কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক জোট যেন বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সীমিত না করে।
বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখা, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং একই সঙ্গে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক ও বাস্তব সুবিধা বয়ে আনলে বাংলাদেশ সেটি বিবেচনা করবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হলে সেই সম্পর্কও বাংলাদেশ রক্ষা করবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যদি বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার সুযোগ তৈরি করে, সেটিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির শেষ কথা হওয়া উচিত কোনো পরাশক্তির স্বার্থ নয়—বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ।
ঢাকার কূটনৈতিক বার্তাটিও তাই পরিষ্কার হওয়া উচিত: বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, শত্রুতা কারও সঙ্গে নয়; কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে শুধু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়।
— সম্পাদকীয়