যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতে ফের বড় উত্তেজনা, পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে ঝুঁকি
মীরা আক্তার ||
এক মাসের তুলনামূলক বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাত তীব্র হয়েছে। মার্কিন বাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন দফা হামলা চালানোর পর ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানে নতুন দফা মার্কিন হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বর ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন দফার হামলা সম্পন্ন করেছে মার্কিন বাহিনী। এসব হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতা, মাইন পাতা-সংক্রান্ত অবকাঠামো এবং যোগাযোগ স্থাপনা লক্ষ্য করা হয়েছে।
CENTCOM-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার চেষ্টা ছিল। এসব হুমকি মোকাবিলার অংশ হিসেবেই নতুন অভিযান চালানো হয়েছে।
জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে পাল্টা হামলার দাবি
মার্কিন হামলার পর ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। Reuters ও AP-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান জর্ডান, বাহরাইন ও ইরাকে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
জর্ডানের পক্ষ থেকে বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানানো হয়েছে। বাহরাইনেও ইরানি ড্রোন মোকাবিলার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত মার্কিন কর্মকর্তারা এসব হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর দেননি।
তবে হামলাগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে কতটা আঘাত লেগেছে, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরানে বেসামরিক হতাহতের খবর
নতুন মার্কিন হামলার মধ্যেই দক্ষিণ ইরানের সিরিক এলাকার কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের স্থানে হামলায় বেসামরিক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
হতাহতের এই সংখ্যা ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে এবং হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কী ছিল, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে উদ্বেগ
সংঘাতের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ঝুঁকির জায়গাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর একটি এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রণালিটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ১ সেপ্টেম্বরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মাত্র পাঁচটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে—যা স্বাভাবিক ১০ দিনের গড়ের তুলনায় অনেক কম।
এর আগে দুটি সৌদি তেলবাহী সুপারট্যাংকারও প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সময় হামলার শিকার হয়েছে বলে Reuters জানিয়েছে। এসব ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দামে প্রভাব
সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার খবরের পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি বেড়ে পাঁচ সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
২ সেপ্টেম্বর Reuters-এর বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, Brent crude-এর দাম প্রায় ৯৫.৫২ ডলার এবং West Texas Intermediate (WTI)-এর দাম প্রায় ৯১.০২ ডলারে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগের মূল কারণ হলো—হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ
নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং ইরানের পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র আরও পদক্ষেপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক বিরতির পর সংঘাত আবার দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের পাল্টা হামলার পরিধি বাড়তে থাকলে সংঘাতটি আরও কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।