যুদ্ধের আঁচে জ্বালানি বাজারে উত্তাপ, ১০০ ডলার ছাড়াল অপরিশোধিত তেলের দাম
নিউইয়র্ক প্রতিনিধি ||
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা ২৪ জুলাইয়ের পর প্রথমবার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক West Texas Intermediate (WTI)-এর দামও ৯৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
সংঘাত বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০.০৭ ডলারে পৌঁছায় এবং পরে দিনের লেনদেনে তা প্রায় ১০০.৮০ ডলার পর্যন্ত ওঠে। গত মাসের শুরু থেকে ব্রেন্টের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অঞ্চলটি থেকে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ আরও ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষ করে ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বাধা এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার খবর বাজারে সরবরাহ-ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। যুক্তরাষ্ট্রের Energy Information Administration (EIA) বলছে, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০.৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবহন হয়েছে—যা বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান।
তবে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে হরমুজ দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরলের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রতিদিন গড়ে ৪.৯ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসে। EIA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে এই প্রবাহ ছিল ২১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন।
বিকল্প পথে তেল পরিবহনের সুযোগ থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা সীমিত এবং পরিবহন ব্যয় ও সময় বেশি। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট আরও বাড়াতে পারে।
জ্বালানি থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ
তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, বিমান চলাচল, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মার্কিন বাজারেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। Associated Press-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম গ্যালনপ্রতি ৪.২২ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫.৯৪ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানি ব্যয়ের এই বৃদ্ধি পরিবহন ও অন্যান্য খাতের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
শেয়ারবাজার ও সুদের হারে প্রভাব
তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে ওঠায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে পারে।
মার্কিন শেয়ারবাজারেও এর প্রাথমিক প্রভাব দেখা গেছে। ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ার সূচকগুলো নিম্নমুখী হয় এবং তেলের দাম বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করেন বিনিয়োগকারীরা।
সরবরাহ ঘাটতির ঝুঁকি কতটা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা IEA-এর আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সামুদ্রিক পরিবহন ব্যাহত হওয়ার কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ গড়ে প্রতিদিন ৪.৩ মিলিয়ন ব্যারেল কমে যেতে পারে। একই সময়ে জুলাইয়ে বৈশ্বিক পর্যবেক্ষিত তেল মজুত এক মাসে ৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল কমেছে এবং যুদ্ধ শুরুর পর মোট মজুতের পতন ৪১০ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কয়েকটি উৎপাদক দেশ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে সরবরাহ ঘাটতির একটি অংশ সামাল দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
OPEC+–এর অবস্থান
তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে OPEC+ দেশগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, কাজাখস্তান, আলজেরিয়া ও ওমানের প্রতিনিধিরা বৈঠক করে অক্টোবরের জন্য সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত উৎপাদন বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। জোটটি বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে।
সামনে কী হতে পারে
বাজার বিশ্লেষকদের প্রধান উদ্বেগ এখন সংঘাতের স্থায়িত্ব এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনের স্বাভাবিকতা। সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এলে তেলের দামে চাপ কমতে পারে। কিন্তু জ্বালানি অবকাঠামোতে আরও হামলা বা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থাৎ, ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করা শুধু একটি মনস্তাত্ত্বিক বাজার-স্তর নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং সুদের হার নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।