২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ শতাধিক রোগী ভর্তি; জনবল ও যন্ত্রের সংকট-জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা
মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার॥
মৌলভীবাজারে জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটে জোড়াতালি দিয়ে চলছে ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা। ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি রোগী ৫০০ ও বহির্বিভাগে প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক চিকিৎসক দিয়ে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। সংকট রয়েছে টেকনোলজিস্ট ও শয্যারও। ৪০৮ টি পদের বিপরীতে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০৩ টি পদ শুন্য রয়েছে। ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
হাসপাতালে আগত রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শয্যার স্বল্পতা এবং অব্যবস্থাপনায় ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা। প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক চিকিৎসক থাকায় বহির্বিভাগে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় চিকিৎসকের দেখা মিলছে না। শুধু চিকিৎসক নয়, জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটে সীমিত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবাও।
মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক সুত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে হাসপাতালটির নতুন ভবন নির্মাণ শেষ হয় এবং এটিকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তর করে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালে ৮৪ জন চিকিৎসক জায়গায় ৭ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট সহ ৪২ জন চিকিৎসক সংকট রয়েছে। একইসাথে টেকনোলজিস্ট ও নার্স সংকট। জনবল সংকট রয়েছে ল্যাব ও এক্স-রে বিভাগেও। ১৪ জন টেকনোলজিস্টের জায়গায় কর্মরত আছেন ৯ জন।
২০১২ সালে নতুন ভবন নির্মাণের সময় আইসিইউ ও সিসিইউ চালু করার জন্য ২০ শয্যা রাখলেও চিকিৎসক ও সরঞ্জামের অভাবে তা চালু করা হয়নি। এগুলো চালু করার জন্য কোন ধরনের সরঞ্জাম নেই এখনও। ২০২১ সাল থেকে এমআরআই মেশিন নষ্ট হওয়ার কারণে এই সেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।প্যাথলজিক্যাল কয়েশো পরিক্ষা থাকলেও হাসপাতালে মাত্র ১২ টি পরিক্ষা নিয়মিত করা হয়। কনসালটেন্ট ও টেকনোলজিস্ট এর অভাবে সপ্তাহে তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটিস্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এই কাজে নিয়জিত একজন কনসালটেন্ট না থাকায় পুরো সপ্তাহ এসব সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ২৫০ শয্যা থাকলেও প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ শত রোগী ভর্তি থাকেন।
বাকিরা ফ্লোরে থাকেন এবং পর্যায় ক্রমে বেডে আসেন।এছাড়াও হাসপাতালের বহির্বিভাগ ১৬শ থেকে ১৭শ রোগী প্রতিদিন চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। ১৫ টি মেশিনে সপ্তাহে ৬ দিন
ডায়ালাইসিস দেওয়া হচ্ছে। তবে সংকট রয়েছে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যেরও। পর্যাপ্ত মেশিন না থাকায় প্রায় ২০০ জন ডায়ালাইসিস রোগী অপেক্ষায় আছেন। এছাড়াও জটিল রোগ ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, নিউরোলজিক্যাল, কিডনিরোগী সহ বেশকিছু জটিল চিকিৎসা নেই এখানে।
জেলার সচেতন নাগরিকেরা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটা মেডিকেল কলেজের দাবী জানাচ্ছি। তবে এটা বাস্তবায়ন হচ্ছেনা। মেডিকেল কলেজ হলে অনেক সমস্যা সমাধান হবে। নয়তো এই জেলার মানুষের সারাজীবন চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে বাস্তবে প্রকৃত কোন চিকিৎসা নেই। এখানে যে চিকিৎসা হয় তা প্রাথমিক চিকিৎসা। এক শতাংশ জটিল কোন রোগ হলে সিলেট রেফার্ড করা হয়। চিকিৎসার অভাবে শতশত গরীব মানুষ মারা যাচ্ছে অথচ তা আমরা হিসেবে আনছিনা।
সরেজমিনে খুঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক রুগী ভর্তির জন্য আসেন। ফলে শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকেই মেঝে কিংবা বারান্দায় গাদাগাদি করে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালে বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।অতিরিক্ত রোগি ও স্বজনদের চাপে টয়লেট সহ সর্বত্র অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।অভ্যন্তরীণ রোগ নির্ণয় ও ল্যাব পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে দালাল চক্র। হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুরবস্থাও বাড়াচ্ছে রোগীদের ভোগান্তি। বিভিন্ন স্থানে ছাদ ও দেয়াল চুইয়ে পানি প্রবেশ করে হাসপাতালের ভেতর। ডায়ালাইসিসের রোগী অপেক্ষাকৃত আছেন অনেক রোগী ।
হাসপাতালে আগত রোগী ও স্বজনেরা জানান, একদিকে চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্টের সংকট, অন্যদিকে অচল গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ মিলছে। সবমিলিয়ে জেলার প্রধান এই হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো রোগী। ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই হাসপাতালের এমন সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তাঁরা।
হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা পারুল বেগম বলেন, মেডিসিনের অভাবে ব্লাড টেস্ট করা হয়নি আমার। এই হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কোন চিকিৎসা নেই। সামান্য কিছু হলেই সিলেট রেফার্ড করা হয়। আমরা চিকিৎসা সেবা থেকে চরম বঞ্চিত হচ্ছি। টাকা দিয়েও ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি না।
আলতা মিয়া নামে একজন কিডনি রুগী বলেন, ডায়ালাইসিস এর জন্য যোগাযোগ করে ছিলাম তবে এখানে সিডিউল পাইনি। জেলার একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্রটি জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এখানে এমআরআই, সিসিইউ, আইসিইউ সেবা একেবারে নেই।
রুগীর স্বজন ইয়ামিন মিয়া বলেন, আমার শাশুড়ীকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে ছিলাম। উনার আলট্রাসনোগ্রাফির প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু এই সেবা এসে বন্ধ পেয়েছি। পরে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
শাকের আহমেদ নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, আমার খালা নিম্ন মধ্যভিত্ত ছিলেন। কিডনির সমস্যার কারনে ডায়ালাইসিস দিতে হয়েছে। ঢাকায় একমাস ডায়ালাইসিস দেওয়ার পর মৌলভীবাজার হাসপাতালে এসে বারবার যোগাযোগ করেছি তবে সিরিয়াল পাইনি। পরে টাকার অভাবে অনিয়মিত ভাবে প্রাইভেট হাসপাতালে কিছুদিন ডায়ালাইসিস দিয়েছেন। পরে ডায়ালাইসিস না দেওয়ায় তিনি মারা গেছেন।
মৌলভীবাজার জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস জানান, আমাদের এই হাসপাতাল ২৫০ শয্য যেহেতু এখানে সংকট স্বাভাবিক আছে। আমরা প্রত্যাকটা সমস্যা সুন্দর ভাবে সমাধানের জন্য কাজ করছি। একই সাথে বিষয়গুলো আমাদের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। জনবল সংকট নিয়ে এসব রোগীর চাপ সামাল দেওয়া অনেক কঠিন।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, হাসপাতালে অনেক সমস্যা আছে এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা হয়েছে। আমরা চাইলেও কিছু করতে পারবো না। কারণ হাসপাতাল পরিচালনার জন্য তাদের নিজস্ব বোর্ড আছে।