চীনে নজরদারি ও নিরাপত্তায় হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির অগ্রগতি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক ||
চীন সামরিক ক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা আরও জোরদার করছে। দেশটির সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নজরদারি, টহল, শত্রুপক্ষের এলাকায় প্রবেশ, রসদ পরিবহন এবং ভবিষ্যতে নগরযুদ্ধের মতো কাজে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত চীনা সামরিক বাহিনীর নিয়মিত ইউনিটে সশস্ত্র হিউম্যানয়েড রোবট মোতায়েনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সামরিক গবেষণায় বাড়ছে হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার
রয়টার্সের শতাধিক চীনা সামরিক ক্রয় নথি, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট, সরকারি নথি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে চীনের সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো হিউম্যানয়েড রোবটের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা বাড়িয়েছে।
গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র হলো রোবটের পরিবেশ শনাক্ত করার সক্ষমতা, সূক্ষ্মভাবে বিভিন্ন বস্তু পরিচালনা, চলাচল এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া। লক্ষ্য হলো মানুষের মতো আকৃতির রোবটকে এমন পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম করা, যেখানে বর্তমানে মানুষের উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ।
নজরদারি ও টহল থেকে নগরযুদ্ধ
চীনা সামরিক গবেষণায় হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাব্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে সামরিক ঘাঁটিতে নিরাপত্তা টহল, নজরদারি, বিপজ্জনক এলাকায় অভিযান এবং শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা।
চীনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির গবেষণাতেও নগরযুদ্ধে মানুষ ও রোবটের সমন্বিত ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ হয়েছে। একটি গবেষণায় সৈন্যদের সঙ্গে একাধিক রোবটকে নিয়ে ভবনে প্রবেশ এবং কক্ষভিত্তিক অভিযান পরিচালনার একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি মডেল করা হয়। গবেষণায় এ ধরনের প্রযুক্তি আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও বাস্তবসম্মত হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
শত্রুপক্ষের এলাকায় প্রবেশের পরীক্ষাও হয়েছে
চীনের সামরিক গবেষণায় শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও যুক্ত হয়েছে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির একটি প্রতিযোগিতায় রোবটকে শত্রুপক্ষের এলাকায় প্রবেশ, নিজে থেকে পথ খুঁজে নেওয়া, পরিবেশের মানচিত্র তৈরি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য শনাক্ত করার মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল।
আরেক ধরনের পরীক্ষায় সামরিক স্থাপনায় পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা পরিদর্শন ও টহলের মতো কাজের মডেল তৈরি করা হয়। এসব কার্যক্রমকে ভবিষ্যতে রোবটকে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের উপযোগী করার গবেষণার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামরিক শিল্পেও যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিটি
চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নরিনকো (Norinco) তৈরি করেছে Fuxi নামের একটি পূর্ণাঙ্গ হিউম্যানয়েড রোবট। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রহরা, সব ধরনের আবহাওয়ায় নজরদারি, বুদ্ধিমান টহল এবং বিপজ্জনক কাজের জন্য ব্যবহারযোগ্য হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।
Fuxi-কে দূর থেকে একজন মানুষ পরিচালনা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ব্যবহার রোবটের নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তার কিছু সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার একটি উপায় হতে পারে।
সামরিক ব্যবহারে এখনো বড় সীমাবদ্ধতা
হিউম্যানয়েড রোবটের প্রযুক্তি দ্রুত এগোলেও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা রয়েছে। ব্যাটারি বা শক্তি ব্যবহারের মাত্রা, দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতা, অনিশ্চিত পরিবেশে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিসের মতে, বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবটকে যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য পুরোপুরি বাস্তবসম্মত বলা কঠিন। তবে আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
সশস্ত্র রোবট নিয়ে নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন
যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় রোবটের ব্যবহার বাড়লে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হবে। বিশেষ করে বেসামরিক মানুষ, আহত সৈন্য কিংবা আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য হবে—এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC) সতর্ক করেছে, আত্মসমর্পণের মতো পরিস্থিতি সবসময় শুধু দৃশ্যমান আচরণ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না; পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য ও আচরণের প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করতে হয়। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও চলতি বছরের মার্চে জানিয়েছিল, এআই-চালিত অস্ত্র ব্যবহারে মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।
চীন একা নয়
সামরিক ক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে গবেষণা শুধু চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রও সৈন্যদের সঙ্গে কাজ করতে পারে এমন সামরিক হিউম্যানয়েড প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।
তবে হিউম্যানয়েড রোবটের উৎপাদন ও সরবরাহে চীনের বড় শিল্পভিত্তি রয়েছে। রয়টার্সের পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের প্রায় ৯৫ শতাংশ চীনা নির্মাতাদের কাছ থেকে এসেছে। ফলে দেশটির সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দ্রুত বিকাশমান একটি দেশীয় রোবট শিল্পকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট—কতটা কাছাকাছি?
বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনের হিউম্যানয়েড রোবটকে ‘রোবট সৈনিক’ হিসেবে বিবেচনা করা এখনই বাস্তবসম্মত নয়। বরং দেশটি এমন প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে সৈন্যদের সহায়তা, নজরদারি, বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ ও সামরিক লজিস্টিকসে ব্যবহার করা যেতে পারে।
রয়টার্সের পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির নিয়মিত ইউনিটে সশস্ত্র হিউম্যানয়েড রোবট মোতায়েনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সামরিক ক্রয়, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম থেকে স্পষ্ট যে ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে রোবটের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে চীন গুরুত্বের সঙ্গে প্রস্তুতি নিচ্ছে।