বৈধ-অবৈধ ১৯৩ টি করাতকলে উজাড় হচ্ছে বনের গাছ;
মাহিদুল ইসলাম,
সিলেট প্রতিনিধি॥
প্রায় ৫৩ হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড় অধ্যষিত মৌলভীবাজারে বৈধ ও অবৈধ করাতকলে প্রতিনিয়ত উজাড় হচ্ছে বনজ সম্পদ। আইনের তোয়াক্কা না করেই অনেকেই অবৈধভাবে কৃষি জমিতে স্থাপন করছেন করাতকল। আর এসব করাতকলে দিনরাত চেরানো চলছে সামাজিক বনায়ন, বনের চোরাইকৃত গাছসহ বিভিন্ন ধরনের কাট। এতে করে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ। উজাড় হচ্ছে বনের মূল্যবান গাছ।
সচেতন নাগরিকেরা বলেন, সময় যত যাচ্ছে করাতকলে অবৈধ গাছ চেরানোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির সংখ্যা কমে আসছে। অনেক করাতকল আছে রাতের আঁধারে অবৈধ গাছ গুলো চেরাই করে দেয়। বন ও সড়কের পাশ থেকে গাছ চুরি করে কোনরকম করাতকলে নিয়ে আসলেই এগুলো বৈধ হয়ে যায়। বন বিভাগের পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তাঁরাও এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না।
জেলার পরিবেশ কর্মীরা বলেন, অবাধে গাছ নিধন করার জন্য একমাত্র
বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর দায়ী। তারা যদি যত্রতত্র করাতকলের ছাড়পত্র ও লাইসেন্স অনুমোদন না দিতেন তাহলে বন গুলো বেঁচে থাকতো। পরিবেশর ক্ষতি হতোনা। এ জেলায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনের মূল্যবান গাছ প্রতিদিন চুরি হচ্ছে। চুরি হওয়া গাছ গুলো করাতকলেই নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে এক-দুটি অভিযান করা হলেও তা যথেষ্ট নয়।
সিলেট বিভাগীয় বন অফিস সুত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলায় মোট ১৯৩ টি করাতকল রয়েছে। এরমধ্যে ১৪২ টির লাইসেন্স রয়েছে।
অবৈধ ১৩ টি ও উচ্চ আদালতে রিট ও স্বত্ব মামলায় আছে আরও ৪০ টি। এছাড়া ৫৩ হাজার ১০৯ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সরেজমিনে জেলার কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া, বড়লেখা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা ঘুরে দেখা যায় সংরক্ষিত বন ও রাস্তার পাশে অসংখ্য করাতকল রয়েছে। এসব করাতকলে বৈধ ও অবৈধ গাছ এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সময়-সুযোগ বুঝে বিক্রি করা হয়। বেশিরভাগ করাতকল কৃষি জমি ভরাট করে স্থাপন করা হয়েছে। রাতের আঁধারেও অনেক করাতকলে গাছ চিরানো হয় যাতে চোরাইকৃত গাছ কেউ দেখতে না পারে। এছাড়া বিভিন্ন সড়কের পাশের গাছ, চা বাগানের ছায়া বৃক্ষ গুলো অবাধে নিধন করে বিক্রি হচ্ছে। অবৈধভাবে গাছ চুরির কারণে সংরক্ষিত বনের ঘনত্ব কমেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী বলেন,
সড়কের পাশ থেকে অনেকেই গাছ চুরি করে করাতকলে নিয়ে আসেন। বৈধ গাছের সাথে চোরাই গাছও বিক্রি করা হয়।
বিশেষ করে গাছ করাতকলে চেরানোর পর আর বোঝা যায় না কোন গাছ চুরির আর কোন গাছ বৈধ। অবৈধ করাতকলগুলো চালু রাখার জন্য মালিকেরা বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন করাতকলের মালিকেরা জানান, অনেক করাতকল আছে যারা অবৈধভাবে করাতকল চালাচ্ছেন। আবার অনেকেই আছেন আদালতে রিট করে চালাচ্ছেন। বনবিভাগ অনেক সময় অভিযান পরিচালনা করলেও যারা অবৈধভাবে করাতকল চালাচ্ছেন তারা সবাইকে মেনেজ করে চলতে হচ্ছে। আমরা সচারাচর চুরাই কাট চেরাই করিনা তবে আমরা তো জানিনা কোন কাট অবৈধ আর কোন কাট বৈধ।
পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, জেলায় অসংখ্য অবৈধ করাত কল আছে। এসব করাতকল থেকে বনবিভাগের লোকেরা নিয়মিত টাকার ভাগ নেন। এজন্য কেউ কিছু বলেননা। জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে কয়েকটি করে করাতকল আছে। প্রতিনিয়তো গাছ চুরি হচ্ছে এসব গাছ কোথাও যায়? পরিবেশকে বাঁচাতে হলো প্রথমে অবৈধ করাতকল বন্ধ করতে হবে।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ মাঈদুল ইসলাম বলেন, আমাদের জনবল নেই এজন্য অভিযান পরিচালনা করতে পারিনা। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও লাইসেন্স বনবিভাগ থেকে দেওয়া হয়।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা
মোঃ আবদুর রহমান বলেন,
মৌলভীবাজারে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু লাইসেন্সবিহীন করাতকল বন্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি কমলগঞ্জে একটি অবৈধ করাতকল বন্ধ করা হয়েছে।যাঁদের কাগজপত্র আছে তাঁদের প্রতি বছর নবায়ন করতে হবে। যেসব করাতকলের লাইসেন্স নেই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই জেলায় অনেক সংরক্ষিত বন রয়েছে। আমরা অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা ও সিলগালা করা হয়। অনেক করাতকল উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় আছে। কেউ যদি চোরাই কাঠ বিক্রি বা চেরাই করলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহন করবো।