বিশ্বে প্রথমবার লাইভ মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচারে সহায়তা করল AI
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক ||
মস্তিষ্কের জটিল অস্ত্রোপচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর ব্যবহার এবার নতুন মাইলফলক তৈরি করেছে। যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো একজন রোগীর মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণের সময় অস্ত্রোপচার চলাকালীন সরাসরি (real-time) AI প্রযুক্তি সার্জনদের সহায়তা করেছে। চিকিৎসকদের দাবি, এই প্রযুক্তির সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু ও রক্তনালি শনাক্ত করে রোগীর দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
অস্ত্রোপচারটি লন্ডনের National Hospital for Neurology and Neurosurgery (NHNN)-এ, University College London Hospitals (UCLH)-এর অধীনে পরিচালিত হয়। UCL-এর গবেষকদের তৈরি AI প্রযুক্তিটি একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রযুক্তিটি National Institute for Health and Care Research (NIHR)-এর অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।
অস্ত্রোপচারের সময় সরাসরি বিশ্লেষণ করেছে AI
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, AI-টি অস্ত্রোপচারের আগে করা কোনো স্ক্যানের ওপর নির্ভর করে শুধু নির্দেশনা দেয়নি। বরং অপারেশন চলার সময় ক্যামেরায় ধারণ করা লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো শনাক্ত করতে চিকিৎসকদের সহায়তা করেছে।
বিশেষ করে মস্তিষ্কের নিচের অংশে থাকা পিটুইটারি গ্রন্থি, রক্তনালি এবং দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুলো অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করে। এই এলাকায় মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ভুলও গুরুতর ক্ষতি, এমনকি অন্ধত্ব বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
AI প্রযুক্তিটি এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো শনাক্ত ও দৃশ্যমান করতে সহায়তা করেছে, যাতে সার্জনরা টিউমার অপসারণের সময় কোন অংশ এড়িয়ে চলতে হবে তা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন।
প্রথম রোগী ৪৮ বছর বয়সী রাইস হিবার্ট
এই পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচার হওয়া প্রথম রোগী হলেন ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ারের ৪৮ বছর বয়সী রাইস হিবার্ট। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাঁটার সময় হঠাৎ পড়ে গিয়ে খিঁচুনি হওয়ার পর পরীক্ষায় তার পিটুইটারি গ্রন্থিতে প্রায় ১১ মিলিমিটার আকারের একটি টিউমার শনাক্ত হয়।
পরবর্তী সময়ে তার দৃষ্টিশক্তির সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তার পার্শ্বীয় দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ায় হাঁটার সময় বারবার সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল।
অস্ত্রোপচারের পর হিবার্টের দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। UCLH জানিয়েছে, অস্ত্রোপচারের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আগের তুলনায় পরিষ্কার দেখতে শুরু করেন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে চশমা বা হাঁটার লাঠি ছাড়াই হাঁটতে পারছিলেন।
সার্জনই ছিলেন নিয়ন্ত্রণে
AI ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে অস্ত্রোপচারটি কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা পরিচালনা করেছে। পুরো প্রক্রিয়ায় সার্জনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অস্ত্রোপচারের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
প্রযুক্তিটি মূলত লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ অ্যানাটমিক্যাল কাঠামো, সার্জিক্যাল যন্ত্র এবং টিস্যুর পারস্পরিক অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করেছে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে জটিল অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকদের জন্য এমন একটি সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা ঝুঁকিপূর্ণ অংশ দ্রুত শনাক্ত করতে পারে।
শত শত অস্ত্রোপচারের ভিডিও দিয়ে প্রশিক্ষণ
AI সিস্টেমটি UCL-এর Hawkes Institute-এর একটি বহুবিষয়ক গবেষক দল তৈরি করেছে। পূর্ববর্তী শত শত পিটুইটারি অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে সিস্টেমটিকে প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, একজন সার্জনের বহু বছর ধরে যত ধরনের অস্ত্রোপচারের অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব, AI প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে বিপুল সংখ্যক অস্ত্রোপচারের উদাহরণ বিশ্লেষণ করতে পারে। তবে প্রযুক্তিটি চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং অস্ত্রোপচারের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফল প্রয়োগ ভবিষ্যতে AI-ভিত্তিক সার্জিক্যাল প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গের অস্ত্রোপচারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্নায়ু, রক্তনালি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো শনাক্ত করার ক্ষেত্রে রিয়েল-টাইম AI সহায়তা চিকিৎসকদের জন্য মূল্যবান হতে পারে।
তবে এটি এখনো গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে রয়েছে। তাই প্রযুক্তিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে এর নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যতা আরও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেন NHNN-এর কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন ও UCL-এর অধ্যাপক হানি মার্কাস। তার সঙ্গে অস্ত্রোপচারের কাজে যুক্ত ছিলেন সার্জিক্যাল রেসিডেন্ট দানিয়াল খান।
UCLH-এর তথ্য অনুযায়ী, এই গবেষণায় NIHR ও Google অর্থায়ন করেছে। পাশাপাশি NIHR Biomedical Research Centre at UCLH, Royal College of Surgeons, Engineering and Physical Sciences Research Council এবং Wellcome-এর সহায়তাও রয়েছে।
রাইস হিবার্ট বর্তমানে বাড়িতে থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন। গবেষকদের আশা, তার অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে আরও নিরাপদ ও নির্ভুল মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে AI প্রযুক্তির ব্যবহার উন্নত করতে সহায়তা করবে।