ব্রিকসের যৌথ ঘোষণাপত্রে যা থাকছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | নিউইয়র্ক ভয়েস বাংলা
ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো সর্বসম্মতভাবে ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন ২০২৬’ গ্রহণ করেছে। ঘোষণাপত্রে বিশ্ব রাজনীতি, যুদ্ধ-সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, গাজা, মধ্যপ্রাচ্য, বাণিজ্য, একতরফা নিষেধাজ্ঞা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের মতো বিস্তৃত বিষয় স্থান পেয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান
ঘোষণাপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা। সদস্য দেশগুলো এ অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
কোনো দেশকে সরাসরি নাম না করে সংঘাত আরও বাড়াতে পারে—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পথ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো সুরক্ষার পাশাপাশি জ্বালানি, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার কথাও বলা হয়েছে।
গাজা ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ
গাজায় চলমান সহিংসতা নিয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় সহিংসতা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ জানিয়েছে BRICS।
ঘোষণাপত্রে গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং পূর্ণ ও বাধাহীন মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো নীতির বিরোধিতা করেছে সদস্য দেশগুলো।
একই সঙ্গে ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ সমর্থনের কথাও বলা হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে এবার কোনো উল্লেখ নেই
এবারের ঘোষণাপত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সরাসরি কোনো উল্লেখ রাখা হয়নি।
গত কয়েক বছরের BRICS ঘোষণাপত্রে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান থাকলেও ২০২৬ সালের নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক বিরোধ সংলাপ, আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পাহেলগাম হামলার নিন্দা
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলারও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে BRICS।
ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের সীমান্তপারের চলাচল, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ঘোষণাপত্রে কোনো দেশকে ওই হামলার জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়নি।
একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্য বাধার বিরোধিতা
BRICS দেশগুলো একতরফাভাবে আরোপ করা শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্য বাধা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, WTO-এর নিয়মের সঙ্গে অসঙ্গত একতরফা শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্য-নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য কমিয়ে দিতে পারে, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে WTO-কে আরও কার্যকর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে BRICS।
একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আরোপ করা একতরফা অর্থনৈতিক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতাও করেছে BRICS।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের মানবাধিকার, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের দাবি
বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে BRICS। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে ভারত ও ব্রাজিলের আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বৈশ্বিক দক্ষিণের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগ
BRICS ঘোষণাপত্রে Global South বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্য খাতেও বেশ কিছু উদ্যোগের কথা রয়েছে। ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দূরবর্তী অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে BRICS-এর Centres of Excellence Network গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিয়ে BRICS Mission for Healthy Lifestyle এবং ২০২৬–২০২৯ মেয়াদের একটি রোডম্যাপ অনুমোদনের কথা রয়েছে।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
BRICS Science and Research Repository গড়ে তোলার উদ্যোগের পাশাপাশি কোয়ান্টাম প্রযুক্তিসহ উদীয়মান প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে জাতীয় আইন, তথ্য নিরাপত্তা ও মেধাস্বত্বের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের BRICS সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য সহজ করা, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতি বিস্তারের বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া BRICS AGRIN নামে কৃষি উপকরণ, জেনেটিক সম্পদ ও তথ্য নিয়ে সহযোগিতামূলক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ, জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, সামরিক ব্যয় বাড়তে থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পরমাণু ঝুঁকি ও নিরস্ত্রীকরণ
বিশ্বে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে BRICS। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, কৃষি, জলবায়ু ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা সংস্কারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান, গাজায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও দুই রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থন, পাহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা, একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য বাধার বিরোধিতা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি।