এসএসসিতে মেয়েদের এগিয়ে থাকার পেছনে বাল্যশ্রম ও পড়াশোনার অভ্যাস
শিক্ষা ডেস্ক ||
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে আবারও ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। এবার মেয়েদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশীয় পয়েন্ট এগিয়ে।
শুধু পাসের হারেই নয়, জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের অবস্থান শক্তিশালী। এবার ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে, যেখানে ছেলেদের মধ্যে এই সংখ্যা ৫২ হাজার ৭৮০। অর্থাৎ জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ১১ হাজার ১১৬ জন এগিয়ে।
দীর্ঘদিন ধরেই বদলাচ্ছে ফলাফলের চিত্র
শিক্ষাবিদদের মতে, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মেয়েদের এই এগিয়ে থাকা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে ২০২৬ সালের ফলাফলে ব্যবধানটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
এবার মোট ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছেলে পরীক্ষায় অংশ নেয়, যার মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন। অন্যদিকে ৯ লাখ ১১ হাজার ৭৯১ জন মেয়ের মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন।
ফলে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছেলের সংখ্যা কিছুটা বেশি হলেও উত্তীর্ণ মেয়ের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় ৭৭ হাজার ১ জন বেশি।
ছেলেদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ও বাল্যশ্রমের প্রভাব
শিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছেলেদের ওপর অল্প বয়সেই পরিবারের আয়ে সহায়তা করার চাপ তৈরি হওয়া তাদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের Multiple Indicator Cluster Survey (MICS)-এর তথ্যেও দেখা যায়, শিশু শ্রমে ছেলেদের অংশগ্রহণ মেয়েদের তুলনায় বেশি। সামগ্রিকভাবে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের ছেলেদের অনেক সময় পরিবারের আয়ে সহায়তা করতে হয়, যার ফলে তাদের পড়াশোনায় সময় কমে যায়।
তবে মেয়েরাও পারিবারিক ও গৃহস্থালি কাজে যুক্ত থাকে। তাই শুধু শিশুশ্রমকে ছেলেদের পিছিয়ে থাকার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
নিয়মিত স্কুলে যাওয়া ও পড়াশোনার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে, মেয়েদের নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পড়াশোনার অভ্যাস ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, অনেক মেয়েই নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে এবং ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করে। অন্যদিকে কিছু ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি মোবাইল ফোন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা অন্যান্য কাজে বেশি সময় ব্যয় করায় পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা হারায়।
শিক্ষাবিদদের মতে, এটি অবশ্য সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং পরিবার, আর্থিক অবস্থা, স্কুলে উপস্থিতি, শিক্ষার পরিবেশ, পড়াশোনার অভ্যাস এবং সামাজিক প্রত্যাশাসহ একাধিক বিষয় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
কিছু অঞ্চলে ব্যবধান আরও বড়
আঞ্চলিক তথ্যেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যবধানের চিত্র পাওয়া যায়।
রংপুর বিভাগে নিম্নমাধ্যমিক বয়সী ছেলেদের মধ্যে নিম্নমাধ্যমিক বা তার ওপরে পড়াশোনায় অংশগ্রহণের হার ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ। একই অঞ্চলে শিশুশ্রমের হারও তুলনামূলক বেশি।
এসএসসি ফলাফলেও কিছু বোর্ডে এই ব্যবধান স্পষ্ট। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে এবার ছেলেদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, বিপরীতে মেয়েদের ৬৩ দশমিক ০১ শতাংশ।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে ব্যবধান আরও বেশি। সেখানে ছেলেদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ হলেও মেয়েদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বৃত্তি ও শিক্ষায় টিকে থাকার প্রণোদনাও ভূমিকা রাখতে পারে
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, মেয়েদের শিক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা উপবৃত্তি ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রণোদনা তাদের পড়াশোনায় ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি ১৯৯০-এর দশকে দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি সমন্বিত হয়ে বর্তমানে নিম্নআয়ের পরিবারের যোগ্য ছেলে-মেয়ে উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া, পরিবারের সমর্থন এবং শিক্ষায় থাকার আর্থিক প্রণোদনা—এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যবধান কমাতে প্রয়োজন ছেলেদের জন্যও সমান সহায়তা
শিক্ষাবিদদের মতে, মেয়েদের ভালো ফলাফলকে ইতিবাচক অর্জন হিসেবে দেখার পাশাপাশি ছেলেরা কেন পিছিয়ে পড়ছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের ছেলেদের শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো, বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে মেয়েদের ক্ষেত্রেও শিক্ষাজীবনে থাকা পারিবারিক ও সামাজিক বাধাগুলো দূর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। কারণ ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ ও সহায়তা নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।