জালিয়াতি-অনিয়মের অভিযোগের পর ডব্লিউএইচওর পদ ছাড়লেন পুতুল
নিউজ ডেস্ক | নিউইয়র্ক ভয়েস বাংলা
জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। তাঁর পদত্যাগ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পাঁচ বছরের মেয়াদে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাঁর নিয়োগ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার পর তাঁকে ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকে বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়। পরে ছুটির মেয়াদ দীর্ঘায়িত হয়।
সায়মার বিরুদ্ধে ডব্লিউএইচওর তদন্তে চীন সফরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ ব্যয়ে আর্থিক অনিয়ম এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০২৬ সালের ৩ জুলাই তাঁর আইনজীবীরা ডব্লিউএইচওকে দেওয়া এক চিঠিতে এসব অভিযোগের জবাব দেন। সেখানে সায়মা ভ্রমণ ব্যয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর এক সহকারী নিয়মিত ব্যয় ফেরতের আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ভুল করেছিলেন। অভিযোগে সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ওঠা অভিযোগও অস্বীকার করেছেন সায়মা। তাঁর আইনজীবীদের চিঠি অনুযায়ী, তিনি অটিজম নিয়ে বাংলাদেশে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন এবং ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোসের কাছে এ যোগ্যতার বিষয়টি পরিষ্কার করেছিলেন।
এ ছাড়া ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকে বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগও তোলা হয়েছিল বলে সায়মার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে সায়মা ওই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি তিনি ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার আগেই পেয়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য বাংলাদেশের একটি আইনের আওতায় তিনি ওই জমির অধিকারী ছিলেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে। ২০২৫ সালের মার্চে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি ও জাল নথি ব্যবহারের অভিযোগে একটি মামলা করে। একই সময়ে শুচনা ফাউন্ডেশনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিলের মাধ্যমে ৩৩ কোটি ৫ লাখ টাকা সংগ্রহের অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
দুদকের মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদে আবেদনের সময় সায়মা তাঁর জীবনবৃত্তান্তে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু একাডেমিক কাজে যুক্ত থাকার তথ্য দিয়েছিলেন, যা সঠিক ছিল না বলে তদন্তকারীদের দাবি। তবে এগুলো দুদকের অভিযোগ ও মামলার বক্তব্য; আদালতের চূড়ান্ত রায় দিয়ে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে—এমনভাবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
এদিকে পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারানোর কথা জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের ক্ষেত্রে তাঁকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় এক বছর ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় তাঁর আর্থিক পরিস্থিতিও অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন তিনি।
রয়টার্স জানিয়েছে, সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের পর ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, আগামী অক্টোবরে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ডব্লিউএইচওর গুরুত্বপূর্ণ একটি আঞ্চলিক নেতৃত্বের পদে তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ আর পূর্ণ হলো না। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্ত এবং অভিযোগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে সায়মার অস্বীকৃতি এবং তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া—দুই দিকই বিবেচনায় রাখা জরুরি।