জামায়াত নেতার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, ন্যাম ভবনে চাঞ্চল্য
NVB News | ঢাকা
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
খবর পেয়ে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে ঘটনাস্থলে ফরেনসিক আলামত সংগ্রহের জন্য সিআইডির ফরেনসিক টিম আসার কথা জানানো হয়। তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরিয়মকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের আগে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে না। তিনি নিজেই গলায় ফাঁস দিয়েছেন, নাকি মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—এখন সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, মরিয়মের মোবাইল ফোনের তথ্য এবং তাঁর মৃত্যুর আগে কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।
মরিয়মের মৃত্যুর খবর এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন তাঁর স্বামী গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক আলোচনা চলছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়ম খাতুনকে ঘিরে একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে গাজী নজরুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে ভিডিওতে থাকা তরুণীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর দাবি ছিল, পারিবারিকভাবে এবং তাঁর প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মরিয়মের সঙ্গে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁর প্রথম স্ত্রীও প্রকাশ্যে মরিয়মের সঙ্গে তাঁর স্বামীর বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন বলে তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
ওই ঘটনার পর বিষয়টি জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরেও আলোচনায় আসে। পরে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জামায়াতের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলাম অবশ্য সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে একমত হননি। তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর ও মরিয়মের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে।
মরিয়মের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর আগের সেই ঘটনাগুলো স্বাভাবিকভাবেই আবার আলোচনায় এসেছে। তবে পুরোনো কোনো বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও কিংবা রাজনৈতিক বিরোধকে মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এ কারণে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন হবে না।
তদন্তকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে, মরিয়মের মৃত্যুর আগে ও পরে ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল তা নিশ্চিত করা। তিনি কখন সেখানে পৌঁছেছিলেন, তাঁর সঙ্গে তখন কেউ ছিলেন কি না, মৃত্যুর আগে কারও সঙ্গে ফোনে বা অনলাইনে যোগাযোগ হয়েছিল কি না, ফ্ল্যাটের দরজা কী অবস্থায় ছিল এবং আশপাশের ক্যামেরায় কোনো অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তদন্তে যদি অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেই অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এদিকে মরিয়ম খাতুনের বয়স মাত্র ১৯ বছর হওয়ায় তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যেও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। একটি তরুণ জীবনের এমন আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য ও অনুমান ছড়িয়ে পড়ার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ফলাফল সামনে আসা জরুরি।
এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাঁর মৃত্যুর কারণ এখনো তদন্তাধীন। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ ও ফরেনসিক তদন্তের পাশাপাশি ময়নাতদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
একজন তরুণীর মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় অনুমান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার চেয়ে সত্য উদঘাটনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মরিয়মের মৃত্যুর পেছনে যা-ই থাকুক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে—এটাই এখন প্রত্যাশা।