Columbus, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিজ্ঞাপন 728 × 90
সর্বশেষ খবর
সংকটে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় ১৪২ পদে নিয়োগ গরু খেয়ে ফেলল গাছের চারা, প্রাণ গেল কৃষকের কোম্পানীগঞ্জে ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে ছয়জন আটক দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের দাবি কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান সার্ভার হ্যাক করে এনআইডি-সিডিআরসহ গোপন তথ্য বিক্রি; নওগাঁয় যুবক গ্রেপ্তার নওগাঁয় ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে ছাত্রদলের পরিচ্ছন্নতা অভিযান মাটির নিচে মদের ভান্ডার, দুর্গাপুরে নারী আটক আসিফ নজরুলের গ্রেপ্তার চাইলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জিয়াউর রহমানকে গুলি করেন মতিউর, হত্যার আগে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রামে যান এরশাদ মৌলভীবাজারে ১৬ লাখ টাকার ভারতীয় ভোগ্যপণ্যসহ গ্রেপ্তার-৩ সেনবাগে কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনায় ‘মেধা উৎসব-২০২৬’ জামায়াত মানুষের মনে ভয় ডুকিয়ে পায়দা লুটার চেষ্টা করছে- রুহুল কবির রিজবী কমলগঞ্জে ধলাই নদীতে ভাসছে টমটম, নিখোঁজ চালক আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ, বড় পরিসরে অনুসন্ধানে দুদক
হোম বাংলাদেশ সংকটে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর

সংকটে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর

নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০:৫৬ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 3
সংকটে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর

মাহিদুল ইসলাম

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি॥


এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি ও বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর নানা সংকটে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। জুড়ী নদীসহ হাওরের সাথে সরাসরি সংযোগ ১০ টি নদী ও অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া হয়ে হাওরে গিয়ে পড়ছে বর্জ্য ও বালু। আর এতেই ভড়াট হয়েছে হাওরের অধিকাংশ বিল, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাওর। শুধু বর্জ্যনয় বিল শুকিয়ে একাধিক বার মাছ শিকার, কৃষিতে ব্যবহিত কীটনাশকের ফলে হাড়িয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছ। দখল হচ্ছে হাওরের উপরিভাগের অংশ। আর এতেই বৈশিষ্ট্য নষ্ট হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় হাওরের।



হাওর এলকার বাসিন্দারা জানান, হাকালুকি হাওর লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। কেউ মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন আবার কেউ কৃষি খেত করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে মাত্র কয়েকবছর হাওরের পরিবেশ দূষণে ভরে গেছে। নির্বিচারে সেচ দিয়ে মাছ শিকার, কীটনাশক প্রয়োগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ না থাকা ও হাওরের জায়গা দখল করে নেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাকালুকি হাওর। বিশেষ করে সরকারি ভাবে হাওর উন্নয়ন বোর্ড করা হয়েছে অথচ বাস্তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাউকে দেখা যায়না।




অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওর এটি এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এর আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর। এরমধ্যে শুধুমাত্র বিলের আয়তন ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। মৌলভীবাজার জেলার় বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী, এবং সিলেট জেলার় ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। জুড়ী, ফানাই, সুনাইসহ ১০টি নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া হাওরের সাথে সংযোগ রয়েছে। জুড়ী, সুনাই ও পানাই নদী এই বিশাল হাওরের মূল প্রবাহ। সময়ের সাথে সাথে পলি বালু জমে প্রায় শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কাগজে কলমে ২৩৮ টি বিল থাকলেও প্রায় অর্ধেক বীলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। যে গুলো অবশিষ্ট আছে এগুলোও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বছর কয়েক আগে যেসব বিলের নাব্যতা ৩৫-৩০ ফুট গভীর ছিলো এগুলো এখন কমে ১৫-২০ ফুট চলে এসেছে। এখনও যে সব বিল বেঁচে আছে এগুলো খনন না করলে আগামী একদশকে ভরাট হয়ে যাবে। এছাড়া ১৮ হাজার হেক্টর হাওরের আয়তন লেখা থাকলেও বাস্তবে কতটুকু আছে তা কেউ জানেনা। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা অনেকেই ঘরবাড়ি করে হাওর দখল করে নিয়েছেন এমন অভিযোগ রয়েছে।


হাকালুকি হাওরে বৈশিষ্ট্য হারানোর বিষয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব ও হাওর কৃষি বিভাগ-এর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নূর হোসেন মিঞা বলেন, কয়েকটি কারণে হাওর বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মানের কারণে পানি প্রবাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানির শ্রুতে যে বালি আসে এগুলো জমা হয়ে আস্তে আস্তে উঁচু হয়ে যাচ্ছে যার ফলে হাওর পানি ধরে রাখতে পারছে না। আমরা যেসব প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছি এগুলো যত্রতত্র হাওরের পানির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি এসব বর্জ্যের কারণে হাওর ভরাট হচ্ছে। উজান থেকে যেসব পানি আসে এগুলো বঙ্গোপসাগরে নামার আগে বড়বড় সেতুর পিলারের কারণে বাঁধা গ্রস্ত হচ্ছে যার ফলে নদীগুলোতে বালু জমা হয়ে চর সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নদীতে আগের মতো পানি ধারণ ক্ষমতা রাখার জায়গা নেই। আমাদের যেসব হাওরে মাছ, ফসল উৎপাদন ও পানি থাকার কথা এসব জায়গায় সবকিছু কমে যাচ্ছে হাওর ভরাট হওয়ার কারণে। পলি মাটির জায়গায় বালু এসে হাওর ভরাট হচ্ছে। হাওর সুরক্ষার জন্য সরকারি ভাবে যতটুকু উদ্যোগ নেওয়ার কথা সেই টুকু নেওয়া হচ্ছে না। এই সব কারণে হাওর তার গভীরতা হারাচ্ছে। হাওরে জলজ উদ্ভিদ কমে গেছে। হাওরে আগের মতো মাছ নেই এর কারণ হলো মানুষ সৃষ্ট বর্জ্য ও পানি দূষণের কারণ।


হাওর পাড় ঘুরে দেখা যায়, জেলার অন্যতম জুড়ী নদী এই নদীর পুরাতন ব্রিজ থেকে নতুন ব্রিজ হয়ে জায়ফরনগর ইউনিয়নের নয়াগ্রামের দিকে যতদূর সামনে এগিয়ে যাবেন ততই দেখবেন সারি সারি প্লাস্টিক, জুতা, পানি ও কোমল পানীয় বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন বর্জ্য এর স্তুপ জুড়ি নদীতে ভাসছে। এই বর্জ্য গুলো সরাসরি গিয়ে পড়ছে দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওরে। আর এসব বর্জ্য হাওরে ভেসে বেড়াচ্ছে।

জুড়ী উপজেলা বাজারের বর্জ্য ফেলার কোন স্থান না থাকায় ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন জুড়ী নদীতে ময়লা আবর্জনা ফেলছেন। এসব বর্জ্য কোন বাঁধা ছাড়া সরাসরি গিয়ে হাকালুকি হাওরে পড়ছে। শুধু জুড়ী নদী নয় সরাসরি হাওরের সাথে যতটা নদী ও ছড়া আছে সব-কয়টা দিয়ে সরাসরি বর্জ্য গিয়ে হাওরে পড়ছে। ফলে হাওরের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এসব বর্জ্য একদিকে দূষিত হচ্ছে হাওরের পানি অন্যদিকে ভরাট হচ্ছে হাওর। হাওর ভরাটের প্রভাবে অল্প বৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা সৃষ্টি হওয়ায় সম্ভবনা রয়েছে। ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে হাওর।


জুড়ী উপজেলার হাওর পাড়ের বাসিন্দা রায়হান আহমেদ বলেন, হাওরে আগের মতো মাছ মিলেনা। হাওরের পানির নিছে হাত দিলেই শুধু প্লাস্টিক হাতে আসে। হাওরের গভীরতা অনেকটাই কমে গেছে। আগে যে জায়গায় ১৫-২০ ফুট গভীর পর্যন্ত পানি ছিলো এখন সেই জায়গায় ৫-৭ ফুট পানি আছে। পলি মাটি ও বালু এসে আস্তে আস্তে বিল গুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারি ভাবে হাওর রক্ষার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতির সালেহ সোহেল বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হাওর। এই হাওরটি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। হাকালুকি হায়রের বীল গুলো জরুরি ভাবে খনন করা প্রয়োজন। দখলকৃত জায়গা মুক্ত করতে হবে। হাওরের জলজ উদ্ভিদ গুলো রক্ষা করতে হবে। হাওরের প্রবেশ পথে ছড়া ও নদীগুলো খনন করতে হবে। এখন হাওরে কি পরিমাণ বিল আছে তা সঠিক হিসেব করা প্রয়োজন।


মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, হাকালুকি হাওরের বর্জ্য যাচ্ছে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দেখা হয়। অথবা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা এটা দেখা শুনা করে এটা তাদের দায়িত্ব। এছাড়া আমাদেরকে বললে আমরা সেখানে যাবো। আমাদের জনবল সংকটের কারণে সবজায়গায় ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া যায় না।


পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, হাওর সংরক্ষণের জন্য সরকারি বিভিন্ন অধিদপ্তর আছে। হাকালুকি হাওরের পরিবেশ রক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন এইসব পদক্ষেপ তাদেরকে নিতে হবে। না হলে হাওর ভরাট হয়ে যাবে। বিশেষ হাওরকে দূষণমুক্ত ও খনন করা এখুনি প্রয়োজন। একটা সময় হাওরে অনেক প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেতো এখন তা আর পাওয়া যায়না। হাওরকে দখল দূষণমুক্ত করতে হবে।



জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো: আরিফ হোসেন বলেন, কাগজে কলমে হাকালুকি হাওরে ২৩৮ টি বিল আছে। তবে বাস্তবে প্রায় শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। হাওরে ৬০ শতাংশ বিল ইজারা দেওয়া হলেও বাকী বিল গুলো ভরাট হওয়ার কারণে ইজারা দেওয়া যাচ্ছেনা। সবজায়গায় ২৩৮ টা বিল উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। অর্ধেক বিল ভরাট হওয়ার কারণে হাওরে পানি থাকেনা। গত বছর হাওরে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া গেছে এই বছর তাও মিলবে না। হাকালুকি হাওর বিভিন্ন কারণে বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। হাওরের বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে হলে বিল গুলো খনন করতে হবে। একটা সময় হাওরে দেশীয় ২৬০ প্রজাতির মাছ ছিলো। ২০১৫ সালের একটি জরিপে ১৪৩ প্রজাতির দেশিয় মাছ পাওয়া গেছে। আগামী জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে জানা যাবে এখন কতো প্রজাতির মাছ হাওরে আছে।



মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, হাওরের সমস্যা নিয়ে আমার কিছু জানা নেই। হাওর উন্নয়ন প্রকল্প হবে কি না এটা আমার বিষয় নয় যারা হাওর নিয়ে কাজ করেন তারা দেখবেন।



বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সি.এম ইউসুফ হোসাইন বলেন, হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে একটা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাওরের বর্জ্যে ব্যবস্থাপনাসহ বেশকিছু উন্নয়ন হবে আশাকরি।