আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ, বড় পরিসরে অনুসন্ধানে দুদক
ঢাকা প্রতিনিধি | নিউইয়র্ক ভয়েস বাংলা
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারসহ বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বড় পরিসরে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে জমা পড়া বিভিন্ন অভিযোগের আর্থিক হিসাব একত্র করলে সম্ভাব্য অনিয়মের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগই প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নথিপত্র পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করেছে দুদক।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো, টেন্ডার ও প্রকল্প বাস্তবায়নে কমিশন নেওয়া এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ।
চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা চারটি দেশে পাচার করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে—
* দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা,
* সিঙ্গাপুরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা,
* অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং
* সুইজারল্যান্ডে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
পাচার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে। পর্তুগালে জমি কেনা এবং দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব এখনো অভিযোগ; দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানের পরই অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ
আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকাকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর অভিযোগও উঠেছে।
বিশেষ করে ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনে তা বেড়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় সংশোধনে ১৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ১০ শতাংশেরও কম থাকার সময়ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। তবে এই ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগতভাবে কোনো অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। বিষয়টি অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করার কথা রয়েছে।
নিয়োগ-পদোন্নতি ও টেন্ডার নিয়ে অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও পদায়নের মাধ্যমে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন টেন্ডার, কেনাকাটা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল কাজ করছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘুষ ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
অনুসন্ধানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ এবং এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ এসেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা, এলজিইডির সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশিত হয়নি।
আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন অভিযোগ
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান অবশ্য একেবারে নতুন নয়। চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতেই তাঁর বিরুদ্ধে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগে আলাদা অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। পরে নতুন করে জমা পড়া অভিযোগগুলোর সঙ্গে আগের অনুসন্ধান সমন্বয় করে আরও বড় পরিসরে বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে।
৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, বিদেশে অর্থপাচার, বেআইনি বিটকয়েন লেনদেন, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে বলেও সে সময় দুদক-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশিত হয়।
অভিযোগের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে?
দুদকের নতুন অনুসন্ধানে বিভিন্ন অভিযোগ একত্র করে আর্থিক অনিয়মের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে বলে ১৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এই অঙ্কটি কোনো আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত অর্থ আত্মসাত বা পাচারের পরিমাণ নয়; এটি দুদকে জমা পড়া অভিযোগগুলোর আর্থিক হিসাবের সমষ্টি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
এখন অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—অভিযোগগুলোর পেছনে কী ধরনের নথি রয়েছে, বিদেশে কথিত অর্থ স্থানান্তরের কোনো আর্থিক রেকর্ড পাওয়া যায় কি না, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কারা জড়িত ছিলেন এবং নিয়োগ-পদোন্নতি বা টেন্ডারে সত্যিই কোনো অবৈধ লেনদেন হয়েছে কি না।
দুদকের অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পরই এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনগতভাবে পরবর্তী পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে।