টানা আন্দোলনে অস্থির পোশাকশিল্প, ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সড়কে শ্রমিকরা
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশ্রমিকরা। মঙ্গলবারও রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল—সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্প খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই বেতনে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন তারা।
মঙ্গলবার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভকারীরা সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কয়েকটি স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষে কয়েক ডজন শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। কিছু কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
এর আগে সোমবার আন্দোলন ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৭০০ পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। মঙ্গলবারও বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা বা সাধারণ ছুটি ঘোষণার খবর পাওয়া গেছে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের বেশ কয়েকটি কারখানা কার্যক্রম বন্ধ রাখে। গাজীপুর ও মিরপুরে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতা বাড়িয়েছে। গাজীপুরসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা বলছেন, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অপর্যাপ্ত মজুরি এবং শ্রমিক সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থেকেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে গত ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করে। তবে বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন থামেনি। শ্রমিকদের একাংশ দ্রুত মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা চায়। অন্যদিকে কারখানা মালিকদের পক্ষ থেকে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি খরচ, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার বিষয়গুলো সামনে আনা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাকশিল্প থেকে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন ও উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা—দুই বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ জন্য শ্রমিক প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মজুরি বোর্ডের আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবির কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং কত দ্রুত শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ফিরবে।