ইরান ইস্যু ও কিমের সঙ্গে সম্পর্ক: দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মহড়া কমালেন ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বার্ষিক ‘আলচি ফ্রিডম শিল্ড’ (Ulchi Freedom Shield) মহড়া শুরুর দিনেই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত সামনে এলো।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত দুটি কারণ সামনে এসেছে—প্রথমত, যৌথ সামরিক মহড়ার ব্যয়, আর দ্বিতীয়ত, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-সংক্রান্ত উদ্যোগে সহযোগিতা না করার বিষয়টি
মহড়া কেন কমাতে বললেন ট্রাম্প?
ট্রাম্প বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বড় আকারের সামরিক মহড়া পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একই সঙ্গে তার মতে, এমন মহড়া উত্তর কোরিয়ার কাছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বৈরী বার্তা পাঠায়। ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ কথাও তুলে ধরেছেন।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতিতে সামরিক চাপের পাশাপাশি পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
দ্বিতীয় কারণ দক্ষিণ কোরিয়ার ইরান নীতি
ট্রাম্পের বক্তব্যে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে—ইরান ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা না করা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তার বিভিন্ন উদ্যোগে মিত্রদের সমর্থন চাইলেও দক্ষিণ কোরিয়া তাতে প্রত্যাশিত সহযোগিতা করেনি বলে ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ফলে সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তকে শুধু উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে নয়, বরং ওয়াশিংটন-সিউল সম্পর্কের বৃহত্তর টানাপোড়েনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
কী এই ‘আলচি ফ্রিডম শিল্ড’?
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া হলো Ulchi Freedom Shield। এ বছরের মহড়া ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে এবং এতে প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সামরিক সদস্য অংশ নেওয়ার কথা। মহড়ায় সম্ভাব্য উত্তর কোরীয় হামলা মোকাবিলায় দুই দেশের সামরিক প্রস্তুতি ও সমন্বয় যাচাই করা হয়।
এবারের প্রশিক্ষণে ড্রোন হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং জিপিএস সিগন্যাল ব্যাহত করার মতো আধুনিক যুদ্ধকৌশল মোকাবিলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহায়তার ফলে দেশটির সেনাদের বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বাড়ছে—এমন উদ্বেগও মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে।
মহড়া কমলেও কার্যক্রম শুরু
ট্রাম্পের নির্দেশের পরও দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী মহড়া শুরু হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের মাত্রা কতটা কমানো হবে, তা নিয়ে নজর রয়েছে।
সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা যখন আরও জটিল হয়ে উঠছে, তখন যৌথ প্রশিক্ষণের সুযোগ কমানো হলে প্রস্তুতিতে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ড্রোন, সাইবার হামলা ও জিপিএস-নির্ভর যুদ্ধকৌশলের মতো নতুন হুমকি মোকাবিলায় নিয়মিত মহড়া গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বার্তা?
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প অতীতেও কিম জং উনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং যৌথ সামরিক মহড়াকে ব্যয়বহুল ও উত্তেজনাপূর্ণ বলে সমালোচনা করেছেন।
এবারও কিমের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে মহড়া কমানোর নির্দেশ দেওয়ায় পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য সংলাপের পথ তৈরি করার চেষ্টা রয়েছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়বে?
যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক জোট দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কৌশলের অন্যতম ভিত্তি। তাই মহড়ার পরিসর কমানোর সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দেশটির আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কিছু বিশ্লেষক।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো—উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
সামনে কী?
ট্রাম্পের এই নির্দেশের ফলে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা খোলা রাখতে চাইছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কিম জং উনের সরকার ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে কীভাবে নেয় এবং এর পর যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সংলাপের নতুন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় কি না। একই সঙ্গে সিউল ও ওয়াশিংটনের সামরিক জোটের ওপর এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে আন্তর্জাতিক মহল।
-নিউইয়র্ক ভয়েস বাংলা