মুছাপুর ক্লোজার: উপকূলীয় জনপদ রক্ষা ও কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো
মোহাম্মদ উল্যা
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি॥
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উপকূলীয় জনপদ রক্ষা, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মুছাপুর ক্লোজার ও রেগুলেটর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে আসছে। ছোট ফেনী নদীর মোহনায় নির্মিত এ প্রকল্পটি কোম্পানীগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী ফেনীর সোনাগাজী এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
স্থানীয়ভাবে মুছাপুর ক্লোজার নামে পরিচিত এ অবকাঠামোর মূল উদ্দেশ্য ছিল জোয়ারের লবণাক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ, বর্ষাকালে উজানের পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং উপকূলীয় এলাকার নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা কমানো। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ছোট ফেনী নদী ড্রেজিং ও ক্লোজার নির্মাণের উদ্যোগের মাধ্যমে এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ২৩ ভেন্টবিশিষ্ট রেগুলেটর ও ক্লোজার বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
মুছাপুর ক্লোজার নির্মাণের পর এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জোয়ারের লবণাক্ত পানি প্রবেশের ঝুঁকি কমে এবং কৃষিজমিতে মিঠা পানির ব্যবহার সহজ হয়। এর ফলে কৃষিকাজ, বিশেষ করে ধান উৎপাদনসহ বিভিন্ন ফসল চাষে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পানি নিষ্কাশনে রেগুলেটরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নদী ও সাগরের মোহনায় পলি জমে নতুন চর জেগে ওঠার প্রক্রিয়াতেও এর প্রভাব রয়েছে।
কালের পরিক্রমায় মুছাপুর ক্লোজার শুধু পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নয়, এটি নোয়াখালীর অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে ওঠে। ক্লোজার, ছোট ফেনী নদীর মোহনা, ঝাউবন ও সমুদ্রঘেঁষা প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন। ফলে স্থানীয় মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রেও পর্যটনকেন্দ্রটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও প্রবল পানির স্রোতে মুছাপুর ক্লোজার ও রেগুলেটরের বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেগুলেটরের কাঠামো ও সংরক্ষণ বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে যাওয়ায় পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এরপর থেকে ছোট ফেনী নদীর মোহনায় জোয়ার-ভাটার প্রভাব পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় এলাকার নদীভাঙন, লবণাক্ত পানি প্রবেশ ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এখন কোম্পানীগঞ্জসহ আশপাশের উপকূলীয় জনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন, জরুরি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা এবং জিওব্যাগসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুধু সাময়িক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, নদীর গতিপথ, পানিপ্রবাহ, জোয়ার-ভাটা ও ভবিষ্যৎ জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, মুছাপুর ক্লোজার ও রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী নকশা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ এ অবকাঠামোর সঙ্গে শুধু একটি এলাকার নয়, বৃহত্তর উপকূলীয় জনপদের কৃষি, পরিবেশ, যোগাযোগ, অর্থনীতি ও মানুষের নিরাপত্তা জড়িত।
মুছাপুর ক্লোজার তাই কেবল একটি বাঁধ বা রেগুলেটর নয়; এটি উপকূলীয় জনপদের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। টেকসই পুনর্নির্মাণ ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এটি পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা গেলে কোম্পানীগঞ্জসহ বৃহত্তর উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।