শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত ভারতের—কোর্ট নাকি সরকারের অনুমোদন, জানালেন চিফ প্রসিকিউটর
ঢাকা প্রতিনিধি
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে দেশটির আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হবে, নাকি সরকারের সিদ্ধান্তেই তাঁকে হস্তান্তর করা হবে—এ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার অবস্থানে অনড় থাকলেও তাঁকে কোন আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে পাঠানো হবে, সেটি নির্ধারণ করবে ভারত।
‘এটা ভারতের বিষয়’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ভারতের কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আদালতের অনুমোদন নিয়ে তাঁকে পাঠানো হবে, নাকি সরকারের অনুমোদনের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হবে—এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নেই।
তিনি বলেন, “তারা কোর্টের অনুমোদন নেবে নাকি সরকারের অনুমোদন দিয়ে পাঠাবে—এটা তাদের ব্যাপার।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের মূল অবস্থান হলো—শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানো; আর প্রত্যর্পণের অভ্যন্তরীণ আইনি ধাপ কী হবে, তা ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে।
দ্রুত ফেরত চায় বাংলাদেশ
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় তিনি দণ্ডিত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু তিনি বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত, তাই ভারত সরকারের উচিত তাঁকে দ্রুত বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা নিজেও ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার কথা বলেছেন। তবে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তাঁকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে তার আগেই ফেরত পাঠানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
ভারতের কাছে প্রত্যর্পণ অনুরোধ, জবাবের অপেক্ষায় ঢাকা
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক আসামিকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানান, শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের আসামিদেরও হস্তান্তরের জন্য ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ঢাকা এখন নয়াদিল্লির আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু শুধু একটি আইনি বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় এবং তিনি অনুপস্থিতিতে দণ্ডিত হন। ভারত থেকে তাঁকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের সফরের আগে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে।
সামনে কী?
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার অবস্থানে পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই। তবে প্রত্যর্পণের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ভারতের হাতে।
ভারত যদি আদালতের মাধ্যমে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়, তাহলে দেশটির নিজস্ব আইন ও বিচারিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে পারে। আবার ভারতীয় সরকার যদি তাদের প্রচলিত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রেও সেটি ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার অংশ হবে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নয়াদিল্লি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রত্যর্পণের আহ্বান জানানো হলেও ভারতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিষয়টি অনিশ্চিতই থাকছে।
নিউইয়র্ক ভয়েস বাংলার বিশ্লেষণ
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখন বাংলাদেশের বিচারিক দাবি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ভারতীয় আইনি প্রক্রিয়া—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থান যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি প্রত্যর্পণের বাস্তব প্রক্রিয়া যে ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, সেটিও পরিষ্কার হয়েছে।
এখন নজর থাকবে নয়াদিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক আলোচনার দিকে।
নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা — সত্যের সন্ধানে, সবার আগে।