বসুরহাটে বর্ণাঢ্য আয়োজনে জন্মাষ্টমী উদ্যাপন
মোহাম্মদ উল্যা,
নোয়াখালীর প্রতিনিধি ॥
শরতের স্নিগ্ধ সকালে ঢোল, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি ও ভজন-কীর্তনের সুরে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভা। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ ও প্রবীণদের অংশগ্রহণে শহরের রাজপথ পরিণত হয় প্রাণবন্ত মিলনমেলায়।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) কোম্পানীগঞ্জে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, গীতা পাঠ, ভজন-কীর্তন, আলোচনা সভা ও প্রসাদ বিতরণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদ, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালীর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা তুলে ধরা হয়।
সকালে পবিত্র গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ১০টায় বসুরহাট পৌরসভা মিলনায়তন সংলগ্ন বটতলা থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়।
শোভাযাত্রায় কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ব্যানার, ফেস্টুন ও ধর্মীয় পতাকা নিয়ে অংশ নেন। ঢোল, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি ও ভজন-কীর্তনের সুরে পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নারী ও প্রবীণদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।
শোভাযাত্রাটি বসুরহাট পৌরসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পৌর বটতলা এলাকায় এসে শেষ হয়।
পরে সেখানে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভায় অতিথি ও বক্তারা জন্মাষ্টমীর ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক ঐক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের। তবে অসুস্থতার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুদুর রহমান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুল হাই সেলিম, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান রিপন, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব জাহিদুর রহমান রাজন, বসুরহাট পৌরসভা জামায়াতের আমির ও মেয়র প্রার্থী মাওলানা মোশারফ হোসাইন, কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ নুরুল হাকিমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক বাবু অরবিন্দ ভৌমিক। তিনি জন্মাষ্টমীর ধর্মীয় ও মানবিক শিক্ষা তুলে ধরে সমাজে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্ম, বর্ণ ও মতের ভিন্নতা থাকলেও রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমান। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার পালনের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজের অন্যতম ভিত্তি।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই বার্তাকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, ধর্মীয় উৎসব শুধু কোনো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথি স্মরণে প্রতিবছর জন্মাষ্টমী পালিত হয়। এ উপলক্ষে প্রার্থনা, গীতা পাঠ, ভজন-কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা, শোভাযাত্রা ও প্রসাদ বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সত্য, ন্যায়, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের কল্যাণের চেতনাও জন্মাষ্টমীর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।
শোভাযাত্রা শেষে দুপুর ১টায় বসুরহাট পৌরসভার শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দির কমপ্লেক্স ভবনে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
আয়োজকদের মতে, ধর্মীয় বিশ্বাস পালনের স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সহাবস্থানের চর্চাই একটি সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি। বসুরহাটের জন্মাষ্টমীর এ আয়োজন সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কোম্পানীগঞ্জে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার বার্তা উঠে এসেছে। ভিন্ন বিশ্বাস ও মতের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানই একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।