ভয়াবহ ফেরি অগ্নিকাণ্ডে ফিলিপাইনে ৫ নিহত, নিখোঁজ ৮৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
পালাওয়ান উপকূলে ‘এমভি জুন অ্যাস্টার’ অগ্নিকাণ্ডে চলছে উদ্ধার অভিযান
ফিলিপাইনের পালাওয়ান প্রদেশের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কোরনের কাছে যাত্রীবাহী ফেরি ‘এমভি জুন অ্যাস্টার’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮৬ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে সমুদ্রে ব্যাপক অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিপাইন কোস্ট গার্ড (PCG)।
ম্যানিলা থেকে কোরনের পথে আগুন
কোস্ট গার্ড ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর বুধবার সন্ধ্যা প্রায় ৬টা ৪৫ মিনিটে কোরন উপকূল থেকে প্রায় ২.২ কিলোমিটার দূরে ফেরিটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। জাহাজটি ম্যানিলার বেসকো বন্দর থেকে কোরনের উদ্দেশে যাচ্ছিল।
ফেরিটির যাত্রী তালিকায় মোট ১৩৪ জন ছিলেন—এর মধ্যে ১১৭ জন যাত্রী এবং ১৭ জন ক্রু সদস্য। আগুন লাগার পর দ্রুত পুরো জাহাজে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কোস্ট গার্ডের প্রকাশ করা ভিডিওতে ফেরিটিকে ব্যাপক আগুন ও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা যায়।
৪৩ জন উদ্ধার, ৮৬ জন নিখোঁজ
প্রথমদিকে ৪২ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হলেও পরবর্তী আপডেটে উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৪৩ জনে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে ৩৮ জন যাত্রী এবং চারজন ক্রু সদস্যের তথ্য আগের পর্যায়ে নিশ্চিত করা হয়েছিল; পরবর্তী একজনকে উদ্ধারের খবরও পাওয়া যায়। পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্যও নিশ্চিত করেছে কোস্ট গার্ড।
তবে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে ৮৬ ও ৮৭—দুই ধরনের সংখ্যা এসেছে। কোস্ট গার্ড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাত্রী তালিকা যাচাই ও চলমান উদ্ধার অভিযানের কারণে সংখ্যাটি পরিবর্তিত হতে পারে। সর্বশেষ ফিলিপাইন নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে ৮৬ জন নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছে।
আগুনের কারণ এখনো অজানা
অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। একজন জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির বর্ণনা অনুযায়ী, আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে কার্গো হোল্ডের দিক থেকে একটি জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। এরপর দ্রুত ধোঁয়া ও আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে তিনি জানান।
তবে কোস্ট গার্ড স্পষ্ট করেছে, এটি এখনো তদন্তাধীন বিষয় এবং বিস্ফোরণই আগুনের কারণ—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
প্রতিকূল আবহাওয়ায় উদ্ধার অভিযান
দুর্ঘটনার পর ফিলিপাইন কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি সামরিক বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি নৌযান ও স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। প্রচণ্ড ধোঁয়া, উত্তাল সমুদ্র, শক্তিশালী স্রোত এবং ফেরিটির ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থার কারণে উদ্ধারকারীদের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু সময়ের জন্য জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করাও সম্ভব হয়নি।
কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে আশপাশের নৌযান ও উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং স্রোতে ভেসে আসা কোনো ব্যক্তিকে দেখতে পেলে কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফেরি পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিয়ে তদন্ত
দুর্ঘটনার পর জাহাজটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য দায়ও তদন্তের আওতায় এসেছে। কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, তদন্তের অংশ হিসেবে আগুন লাগার আগে ও পরে ক্রুদের কার্যক্রম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য অবহেলার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষকে দায়ী করা হয়নি।
কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এমভি জুন অ্যাস্টার ২০২২ সালে নির্মিত এবং এর অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ছিল ৩৩৩ জন। দুর্ঘটনার আগে জাহাজটি প্রি-ডিপার্চার পরিদর্শন এবং ২০২৬ সালের মার্চে ভেসেল সেফটি এনফোর্সমেন্ট পরিদর্শনও সম্পন্ন করেছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নিখোঁজদের সন্ধানে অপেক্ষায় স্বজনরা
দুর্ঘটনার পর কোরন এলাকায় নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে তাদের স্বজন ও পরিচিতদের বিষয়ে তথ্য জানতে আবেদন করছেন। কর্তৃপক্ষ যাত্রী তালিকা যাচাই করে নিখোঁজদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার ও নিখোঁজের সংখ্যা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন
ফিলিপাইন একটি দ্বীপপুঞ্জভিত্তিক দেশ হওয়ায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ফেরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশটিতে অতীতেও বেশ কয়েকটি বড় সামুদ্রিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফলে নতুন এই অগ্নিকাণ্ডের পর ফেরি পরিচালনা, জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং উদ্ধার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এমভি জুন অ্যাস্টার দুর্ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে সরকারি তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে কর্তৃপক্ষ।