নোয়াখালী-৫ আসনে মন্ত্রী-নির্ভর রাজনীতির পর নতুন বাস্তবতা
মোহাম্মদ উল্যা
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি:
স্বাধীনতার পর থেকে নোয়াখালী-৫ আসনের রাজনীতিতে একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে—এই আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশই ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী। ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের কাছে ‘এমপি’ পরিচয়ের চেয়ে ‘মন্ত্রী’ পরিচয়ই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
তবে এর একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল। ওই সময়ে জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নোয়াখালী-৫ আসনের এমপি ছিলেন, আর সরকারে ছিল বিএনপি। এর আগে ও পরে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির হয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওবায়দুল কাদের। ফলে নোয়াখালী-৫-এর ভোটাররা বছরের পর বছর মন্ত্রীকেই নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
এ কারণে স্থানীয় অনেকের ধারণা, ‘মন্ত্রী দেখতে দেখতে এখন আর সাধারণ এমপিকে হিসাবের খাতায় রাখে না’—এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। মন্ত্রী থাকার সময়ে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় অনেক সময় জনগণকে দাবি-দাওয়া নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়নি বলেও স্থানীয়দের অনেকে মনে করেন।
কিন্তু ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেরিয়ে গেলেও নোয়াখালী-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো, যোগাযোগ, জননিরাপত্তা ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জসহ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন সড়কে ভারী বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কের স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত আড়াই বছরে বিপুল পরিমাণ বালু পরিবহনে অতিরিক্ত ওজনের ভারী ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন সড়কের অবস্থা দ্রুত deteriorate করেছে এবং কোথাও কোথাও যান চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগের তালিকায় রয়েছে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারকেন্দ্রিক অনিয়ম, সড়কে অবৈধ আদায় এবং বিভিন্ন বাজারে পরিবহন থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ। এসব অভিযোগের কারণে সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে হতাশ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
অন্যদিকে, স্লুইসগেট ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর ক্ষতি, নদীভাঙন এবং দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যাও এলাকার মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মেঘনা ও ছোট ফেনী নদীঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জন্য নদীভাঙন একটি স্থায়ী দুর্ভোগ। প্রতিবছর ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবারকে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়।
নোয়াখালী-৫ আসনের ভৌগোলিক পরিসরও বড়। পূর্বে ছোট ফেনী নদী ও সোনাগাজী, পশ্চিমে মাইজদীর রেললাইন, উত্তরে দাগনভূঞা এবং দক্ষিণে মেঘনা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এ এলাকায় মানুষের প্রত্যাশাও ব্যাপক। কিন্তু স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব প্রাপ্তির ব্যবধান দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—রাস্তা, সেতু, কালভার্টসহ অধিকাংশ অবকাঠামো নির্মাণ সরাসরি একজন সংসদ সদস্যের নির্বাহী দায়িত্ব নয়। এসব কাজের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু স্থানীয় সরকার কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল বা অকার্যকর থাকায় জনগণ স্বাভাবিকভাবেই তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কাছে সমন্বয়, তদারকি ও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
নির্বাচনের আগে বর্তমান সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, অবৈধ বালুবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচনের পর এসব প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবে কার্যকর হয়েছে?
কারণ এলাকার উন্নয়ন কেবল নতুন রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা বড় প্রকল্পের নাম নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকার, আইনের শাসন, স্বাস্থ্যসেবার সহজপ্রাপ্যতা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দখল ও চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ এবং স্বাভাবিক নাগরিক জীবন নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে অতিরিক্ত ওজনের বালুবাহী ট্রাক চলাচল অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন সড়কের স্থায়িত্ব কমে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই স্থানীয়দের মতে, অবৈধ বালুমহল, অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন এবং সড়কে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এমপি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
নোয়াখালী-৫ আসনের মানুষের প্রত্যাশা এখন তাই শুধু ‘মন্ত্রী’ নয়; তারা চান কার্যকর জনপ্রতিনিধিত্ব। চান নিরাপদ সড়ক, চাঁদাবাজিমুক্ত বাজার, অপরাধমুক্ত পরিবেশ, সহজ স্বাস্থ্যসেবা, নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ এবং আইনের শাসন।
দীর্ঘদিন মন্ত্রীনির্ভর রাজনীতির অভিজ্ঞতার পর নোয়াখালী-৫ এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। মন্ত্রী না থাকলে উন্নয়ন থেমে যাবে—এমন ধারণার পরিবর্তে জনগণ এখন দেখতে চান, একজন সংসদ সদস্য তার সাংবিধানিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কতটা কার্যকরভাবে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ব্যবধান ঘুচতে নোয়াখালী-৫ আসনের মানুষকে কি আরও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে?
এখন সময় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, দৃশ্যমান বাস্তবায়নের।