শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় সরকার
ঢাকা প্রতিনিধি ||
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করতে শিক্ষকদের জন্য ‘One Teacher, One Tab’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে সরকার। তবে কর্মসূচিটির এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি। ফলে কবে থেকে শিক্ষকদের মধ্যে ট্যাব বিতরণ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি।
সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন জানান, শিক্ষকদের ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘One Teacher, One Tab’ উদ্যোগটি বর্তমানে সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তবে কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে প্রকল্প বা সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির অনুমোদন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
অনুমোদনের পর শুরু হবে পাইলট কার্যক্রম
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচিটি একবারে সারাদেশে বাস্তবায়নের পরিবর্তে প্রথমে পাইলট ভিত্তিতে শুরু করার কথা রয়েছে। পাইলট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে এর বিস্তৃতি ঘটানো হবে।
তবে ঠিক কতজন শিক্ষক এই কর্মসূচির আওতায় আসবেন এবং কোন পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রথম ধাপে ডিভাইস দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
শুধু ট্যাব বিতরণ নয়, থাকছে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা
সরকারের পরিকল্পনায় শুধু শিক্ষকদের হাতে ট্যাব তুলে দেওয়াই নয়; এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল কনটেন্ট, ইন্টারনেট সংযোগ, ডিভাইস মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপদ ডিভাইস ব্যবস্থাপনার বিষয়ও রাখা হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, বাস্তবায়নের আগে শিক্ষকের সংখ্যা ও তাদের প্রয়োজন নিরূপণ, ডিভাইসের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল কনটেন্ট প্রস্তুত করার মতো প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হবে।
বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা
মাধ্যমিক ও সমমান পর্যায়ে ‘One Teacher, One Tab’ উদ্যোগটি কয়েকটি প্রস্তাবিত প্রকল্প ও কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘Teachers’ Technological Support Scheme’, ‘Technological Support and Smart Learning Environment in Secondary and Higher Secondary Educational Institutions’ এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ‘NextGen Secondary Education Programme’।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের ট্যাব দেওয়ার বিষয়টি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত Primary Education Development Programme (PEDP-5) অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর ট্যাব সংগ্রহ ও বিতরণ শুরু হতে পারে বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণেও জোর
ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম সফল করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, LAISE প্রকল্পের আওতায় ৫৯ হাজার ১৭০ জন শিক্ষক blended-learning প্রশিক্ষণ এবং ২৯ হাজার ৫৮৫ জন ICT প্রশিক্ষণ পাবেন।
এ ছাড়া ‘Establishment of Education at Secondary and Higher Secondary Levels through ICT’ প্রকল্পের আওতায় ৫ লাখ ২১ হাজার ১১২ জন শিক্ষক ইতোমধ্যে ICT প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত NextGen কর্মসূচিতে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসককে দেশে পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাস্তবায়নের আগে যেসব কাজ করতে হবে
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘One Teacher, One Tab’ বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
* শিক্ষক সংখ্যা ও প্রয়োজন নির্ধারণ;
* ট্যাবের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত করা;
* প্রয়োজনীয় ডিজিটাল শিক্ষা কনটেন্ট তৈরি;
* ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা;
* শিক্ষকদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া;
* ডিভাইস মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা;
* নিরাপদ ডিভাইস ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা;
* প্রকল্প অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ;
* সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
এসব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর পাইলট ভিত্তিতে কর্মসূচি শুরু এবং পরে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে কর্মসূচিটির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মানসম্মত ডিভাইস, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ওপর।